আল-জাজিরা
ইরানের সরকারকে উৎখাত করাই তাঁর দেশের ‘প্রধান লক্ষ্য’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন। এর আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন কমতে দেখা যাচ্ছে। এমন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরানে নতুন করে হামলার ইঙ্গিত দিয়ে তাঁর এই ঘোষণা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, ইরানের সামরিক শক্তিকে বিপর্যস্ত করার সক্ষমতা থাকলেও দেশটির সরকারকে উৎখাত করার মতো বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা কি ইসরায়েলের হাতে রয়েছে?
সামরিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন, ইরানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সামর্থ্য ইসরায়েলের রয়েছে। কিন্তু সামরিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া আর একটি দেশের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি বিমান হামলার মাধ্যমে সম্ভব হলেও দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিকল্পনা, বিপুল সামরিক শক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযান। ইরানের সরকারকে উৎখাত করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই—ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সক্ষমতা থাকলেও সেই ধ্বংসযজ্ঞকে রাজনৈতিক বিজয়ে রূপ দেওয়ার কোনো সুস্পষ্ট কৌশল এখনো সামনে আসেনি।
শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অন্যদিকে স্থল অভিযান চালাতে গেলে প্রয়োজন হবে বিশাল সামরিক প্রস্তুতি, বিপুলসংখ্যক সেনা এবং দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা। ইরানের মতো বিস্তীর্ণ ও দুর্গম ভূখণ্ডের দেশে এমন অভিযান চালানো ইসরায়েলের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি বড় বাধা। যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে মাটির অনেক গভীরে থাকা ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে কার্যকর হামলা চালানো কঠিন। গভীর ভূগর্ভে সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার মতো শক্তিশালী অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা ওয়াশিংটনের হাতে থাকলেও তেল আবিবের হাতে তা নেই।
গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর আলোচনা হয়। একই সময়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরায়েল সফর করেন। এসব ঘটনার পরই নেতানিয়াহু ইরানের সরকার উৎখাতের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে নতুন করে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, কিংবা ইরানের নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযানে ওয়াশিংটন সরাসরি যুক্ত হবে কি না—সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেননি।
ইরান ইতিমধ্যে দুই দফা হামলা মোকাবিলা করেও টিকে আছে। দেশটির পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতাও এখনো রয়েছে। শুধু ইসরায়েল নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোতেও হামলা চালাতে পারে তেহরান। এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা থাকায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) গবেষক আরবান কনিংহামের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে মাটির গভীরে থাকা ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো কঠিন হবে। কারণ, এ ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই।

অন্যদিকে নতুন করে যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি মেনে নিতে ইরানের সরকারকে বাধ্য করার কোনো বিশ্বাসযোগ্য পথ এখনো খুঁজে পায়নি যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলেই ইরানকে রাজনৈতিকভাবে নতিস্বীকার করানো যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইসরায়েলের সামরিক শক্তি কতটা ভয়ংকর?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানে আবারও বড় ধরনের হামলা চালানোর সামরিক সক্ষমতা ইসরায়েলের রয়েছে। এ নিয়ে তেমন কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেই সক্ষমতা দিয়ে কতটা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
রুসির গবেষক আরবান কনিংহাম আল-জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের মজুত রয়েছে। পাশাপাশি আকাশে যুদ্ধবিমানে জ্বালানি ভরার সক্ষমতাও দেশটির রয়েছে। এসব সুবিধা ইসরায়েলকে বড় ধরনের সামরিক সুবিধা দেয়। তাঁর মতে, ইসরায়েল আবারও আকাশে আধিপত্য বিস্তার করে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারবে।
কিন্তু আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা আর শত্রুর রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দেওয়া এক নয়। ইরানের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো সম্ভব হলেও এর মধ্য দিয়ে দেশটির সরকার পতন নিশ্চিত করা যাবে—এমন ধারণার পক্ষে শক্ত ভিত্তি নেই।
১৯৯৬ সালে প্রথমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই নেতানিয়াহু ইরানের নেতৃত্বকে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরে আসছেন। ওই বছরের জুলাইয়ে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘এসব শাসনব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো ইরানের শাসনব্যবস্থা। সেখানে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসনের সঙ্গে উগ্র জঙ্গিবাদের মেলবন্ধন ঘটেছে।’
প্রায় তিন দশক ধরে ইরানকে ঘিরে নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা-উদ্বেগ ও কঠোর অবস্থান বজায় রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়। এরপর চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এর মধ্য দিয়ে ইরানে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের যে দাবি নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছিলেন, তা বাস্তবে রূপ নেয়।
কিন্তু এত বড় সামরিক পদক্ষেপ এবং ইরানের ওপর দফায় দফায় চাপ সৃষ্টির পরও দেশটির সরকারের পতন ঘটেনি। অর্থাৎ সামরিক শক্তির ব্যাপক প্রয়োগও এখন পর্যন্ত নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।
গত মার্চে নেতানিয়াহু নিজেও স্বীকার করেন, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে সরকার উৎখাত করা সম্ভব নয়। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে সরকারের পতন ঘটানো যাবে না।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ জন্য স্থল অভিযান প্রয়োজন। তবে সেই অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে, কত সেনা মোতায়েন করতে হবে কিংবা দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে ইরানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব—এসব প্রশ্নের কোনো ব্যাখ্যা তিনি দেননি।
তুরস্কের কায়সেরি শহরের আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক চাগলার কুরচ বলেন, বোমা হামলার মাধ্যমে ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল করা সম্ভব। কিন্তু এতে দেশটির পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হবে না।
আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘বিমান হামলার মাধ্যমে সামরিক সক্ষমতা কমানো যায়। কিন্তু আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা যায় না। ভালোভাবে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রব্যবস্থাগুলো টিকে যাবে।’
কুরচের মতে, ইরানের সরকার উৎখাত করতে হলে সেখানে সেনা মোতায়েন করতে হবে। শুধু তা-ই নয়, কয়েক বছর ধরে সেনা রাখার প্রস্তুতিও থাকতে হবে। আগের হামলাগুলোতে ইসরায়েল যে গোপন কৌশল ব্যবহার করেছে, ভবিষ্যতের অভিযানেও সেগুলো একইভাবে কার্যকর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
কনিংহাম গোয়েন্দা কার্যক্রমে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপায় ও নেটওয়ার্ককে এমন সম্পদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা একবার ব্যবহারের পর হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তাঁর মতে, এসব কৌশল প্রয়োগ করলে গোপন গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। এরপর ইরানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তদন্ত চালিয়ে সেগুলো শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করবে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ভেতরে ইসরায়েলের এখনো ‘মানব গোয়েন্দা’ রয়েছে। নতুন কোনো অভিযানে সাইবার হামলাও চালানো হতে পারে। কিন্তু এসব কৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি রয়েছে। একবার গোপন নেটওয়ার্কের পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে ভবিষ্যতে সেগুলো ব্যবহার করার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। ফলে গোয়েন্দা সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কতটা স্থায়ী সামরিক সাফল্য অর্জন করা যাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
ইরানে স্থলযুদ্ধের ছক কতটা বাস্তবসম্মত?
কনিংহামের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গোপন অভিযান ও সাইবার হামলার মাধ্যমে ইরানের সরকার উৎখাতের কোনো সুস্পষ্ট পথ নেই। ইরানের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধে কুর্দি বা বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করার সম্ভাবনা নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন।

গত মার্চে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছে। কুর্দি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে সিএনএন এ তথ্য জানিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ওই উদ্যোগ আর এগোয়নি।
কনিংহামের মতে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো সামরিক সক্ষমতা কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ছিল না।
এখানেই ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য স্থলযুদ্ধের অন্যতম বড় জটিলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো দেশের ভেতরে বিদ্রোহী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে কাজে লাগানো গেলেও তাদের দিয়ে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ফেলা এবং সরকার উৎখাত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। ইরানের ক্ষেত্রে এমন কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও পরিণতি নিয়ে এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইরানের পাল্টা আঘাতের ক্ষমতা এখনো বড় হুমকি
ইরানে নতুন করে হামলা চালালে ইসরায়েলকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর জন্য ইরানের কাছে ইসরায়েলের সমানসংখ্যক যুদ্ধবিমান থাকা জরুরি নয়। বরং ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং সুরক্ষিত অস্ত্রভান্ডার ব্যবহার করেই তেহরান প্রতিপক্ষের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
রুসির জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল আল-জাজিরাকে বলেন, ইরানের হাতে সম্ভবত এখনো বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। তবে দেশটির লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও নির্ধারণের ব্যবস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কার্যকারিতা কিছুটা কমে যেতে পারে।
কৌশল বলেন, ‘ইরানের হাতে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সম্ভবত এখনো অনেক বেশি। কারণ, এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি তুলনামূলক সহজ। পুরোনো চীনা জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের (এএসসিএম) বড় অংশই এখন ইরান নিজ দেশে তৈরি করে। এ ছাড়া ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়গুলো বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার প্রাকৃতিক আশ্রয় হিসেবে কাজ করে।’
অর্থাৎ ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির হাতে থাকা সব পাল্টা আঘাতের উপায় যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তা বলা যাচ্ছে না। ভূপ্রকৃতির সুবিধা এবং তুলনামূলক সহজে কিছু অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে ইরানকে সুবিধা দিতে পারে।
কনিংহামের মতে, নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘ সময় সচল রাখাও ইসরায়েলের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আগের সংঘাতগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে গিয়ে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত অনেক কমে গেছে।
এর সঙ্গে রয়েছে যুদ্ধের বিপুল আর্থিক ব্যয়। ইরানের তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে ইসরায়েলকে অনেক বেশি দামি প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে। বারবার হামলা ও পাল্টা হামলা চললে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে। অন্যদিকে ইরান দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলক কম খরচে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র উৎপাদনের সুযোগ পেতে পারে।
এই অসম ব্যয়ের হিসাব দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একদিকে প্রতিটি হামলা প্রতিহত করতে ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষকে একই মাত্রায় দুর্বল করে দেওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে না। ফলে সামরিক আঘাতের পাশাপাশি অস্ত্রের মজুত, উৎপাদনক্ষমতা ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থনৈতিক সামর্থ্যও সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কি বড় হামলার পরিকল্পনা?
ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়া নেতানিয়াহুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের রাজনৈতিক স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। ইসরায়েল যেখানে ইরানের সরকার উৎখাতকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাব্য মূল্যও বিবেচনা করতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে সংঘাত বাড়ানো থেকে বিরত থাকার চাপের মুখে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
চলতি সপ্তাহে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে ইসরায়েল ওয়াশিংটনের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে সেই প্রস্তাবে ট্রাম্পের অনুমোদন মেলেনি। প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আপাতত হামলা চালানো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে।
তবে এই মতভিন্নতার অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে ইরানে হামলার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেছে। বরং তা দেখিয়ে দেয়, ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হিসাব-নিকাশে পার্থক্য রয়েছে।
কনিংহামের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে মাটির অনেক গভীরে থাকা ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো কঠিন হবে। কারণ, এ ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যে সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, তা ইসরায়েলের নেই।
এর মধ্যে রয়েছে ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের জিবিইউ-৫৭ বাংকারবিধ্বংসী বোমা। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমান থেকে ইরানের ফোরদো ও নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় এসব বোমা ফেলা হয়েছিল। মাটির অনেক গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তৈরি এই অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রকে এমন সামরিক সক্ষমতা দিয়েছে, যা ইসরায়েলের পক্ষে একা অর্জন করা সম্ভব নয়।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বিষয় নয়; ইরানের গভীরে সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন পাশে না থাকলে ইসরায়েলের সামরিক বিকল্প সীমিত হয়ে পড়তে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নিলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ইরানে হামলা মানেই কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত?
কনিংহাম আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া ইসরায়েল ইরানে হামলা চালালে তেহরান পাল্টা আঘাতের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ইসরায়েলের ভূখণ্ডকে বেছে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইরান মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে পারে।
এ ধরনের কৌশলের উদ্দেশ্য হতে পারে ইসরায়েলকে শাস্তি দেওয়া, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে না ফেলা। তবে সংঘাতের গতিপথ এমনই থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের কূটনৈতিক অবস্থানও আরও চাপে পড়তে পারে। গাজায় দেশটির সামরিক অভিযানের কারণে ইসরায়েল ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশের কাছে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর সামরিক হুমকির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে যাচ্ছে: ইসরায়েল কি সামরিক ধ্বংসযজ্ঞকে রাজনৈতিক বিজয়ে রূপ দিতে পারবে?
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের সামরিক শক্তি এবং তার রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। দেশটি ইরানের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করতে পারে, অস্ত্রের মজুত ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু এসব সাফল্য দিয়ে ইরানের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে ফেলা যাবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক চাগলার কুরচ বলেন, ‘আপনি যদি সেনা মোতায়েন করতে এবং কয়েক বছর ধরে একটি দেশে অবস্থান করতে প্রস্তুত না থাকেন, তাহলে সেখানকার সরকার পরিবর্তন করতে পারবেন না। ইসরায়েল একা ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রও আরেকটি সরকার পরিবর্তনের অভিযানে জড়াবে না। কারণ, এমন অভিযানে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে।’
নেতানিয়াহুর সামনে তাই দ্বিমুখী সংকট। একদিকে ইরানে হামলা চালানোর সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, অন্যদিকে সেই হামলার মাধ্যমে সরকার উৎখাতের লক্ষ্য অর্জনের পথ অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া গভীর ভূগর্ভে থাকা সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা কঠিন। আর যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে পেলেও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, ইরানের পাল্টা হামলা এবং রাজনৈতিক পরিণতির ঝুঁকি থেকে যাবে।
ইরানের সামরিক শক্তিকে আঘাত করা সম্ভব, কিন্তু দেশটির সরকারকে উৎখাত করা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার চ্যালেঞ্জ, নেতানিয়াহুর ঘোষণার সামনে সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

