বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা দাবিতে বিক্ষোভ চলছে। কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদ, কোথাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন, আবার কোথাও শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। বৃহস্পতিবার ফ্রান্স, সার্বিয়া, তিউনিসিয়া, কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলায় বিক্ষোভের খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
এর মধ্যে আগামী ৩১ অক্টোবর জার্মানির ২১টি শহরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে তরুণদের একটি সংগঠন। দেশভেদে কারণ ও ধরন আলাদা হলেও অনেক জায়গাতেই তা সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও আটকের ঘটনায় গড়িয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনের বরাতে ইত্তেফাক এ তথ্য জানিয়েছে।
ফ্রান্সে বিক্ষোভের সূত্রপাত গত ১৭ সেপ্টেম্বর, প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বে ক্রেতেই শহরের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে। শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে শিক্ষকেরা আন্দোলন শুরু করেন, পরে শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। ধীরে ধীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা ছাপিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভের একাংশ সহিংস হয়ে ওঠে। বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাট, সরকারি ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়। লিমোজের ঐতিহাসিক টাউন হলে আগুন দেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষের হিসাবে, গত সপ্তাহান্ত থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৭৪ জনকে বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছে, আর ৯০০-এর বেশি মানুষের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চলছে। নতুন কর্মসূচির আগে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বৃহস্পতিবার জানান, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিক্ষোভ নিষিদ্ধ। স্বীকৃত সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়নকে অনুমতি দেওয়া হতে পারে, তবে নিরাপত্তার স্বার্থে স্থান বদলানো হতে পারে। লিওঁসহ কয়েকটি শহরে শনিবারের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে বৃহস্পতিবার হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। তাঁদের প্রধান দাবি অবাধ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং বিরোধী নেত্রী ও শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া কারিনা মাচাদোকে দেশে ফিরতে দেওয়া। মাচাদো এখন নির্বাসনে আছেন। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারাকাসে প্রায় দুই হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে জড়ো হন। কলম্বিয়া সীমান্তের তাচিরা এবং উত্তর-পূর্বের বলিভারেও বিক্ষোভ হয়েছে। তাচিরায় সমাবেশস্থলে যাওয়ার সড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় বিক্ষোভকারীরা প্রতিবাদ জানান। বিরোধী সমর্থক এরিকা সেদেনো বলেন, তাঁরা নির্বাচন ও মাচাদোর ফেরার দাবি জানাচ্ছেন। দরজি মায়রিম বেলত্রান বলেন, তাঁরা ক্লান্ত, সত্যিকারের পরিবর্তন চান।
সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে বৃহস্পতিবার সরকারবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের সমর্থনে বড় সমাবেশ হয়। আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে আয়োজিত এ সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। তাঁদের লক্ষ্য আলেকসান্দার ভুসিচের নেতৃত্বাধীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টিকে ভোটে হারানো। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ শহরের রেলস্টেশনের ছাউনির একটি অংশ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর দুর্নীতির তদন্ত ও জবাবদিহির দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হয়। প্রায় দুই বছরের আন্দোলনে পরে আগাম নির্বাচনের দাবিও যুক্ত হয়।
চাপের মুখে গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়েন ভুসিচ। তবে রাজনীতি ছাড়েননি। এবার নিজের দলের নেতৃত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্যে নির্বাচনে লড়ছেন। শিক্ষার্থীদের সমর্থিত ‘স্টুডেন্টস লিস্ট’ ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। জনমত জরিপে দুই পক্ষের ব্যবধান কম বলে আভাস মিলছে। তবে মূলধারার গণমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সমালোচনা আছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফলাফল নিয়ে বিরোধ হলে ভোটের পর অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মারিয়া নেদেলকোভিচ রাদিচ বলেন, তরুণেরা তাঁকে নতুন আশা দেখিয়েছেন।
তিউনিসিয়ায় রাজধানীর উপকণ্ঠ ইততাদামেনে পুলিশি হেফাজতে এক ব্যক্তির মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী সন্দেহে তাঁকে আটক করা হয়েছিল। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশি নির্যাতনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা তদন্ত ও জবাবদিহি চান। তবে স্থানীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য, মাদকদ্রব্য গিলে ফেলার পর তিনি মারা যান। বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করেন, টায়ারে আগুন দেন ও পুলিশের দিকে পাথর ছোড়েন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। দক্ষিণের স্ফাক্স গভর্নরেটের জেবিনিয়ানা শহরেও এক ব্যক্তির মৃত্যু ঘিরে বিক্ষোভ হয়।
স্বজনদের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা একটি গাড়িতে আগুন দেন ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। স্ফাক্স শহরে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় সহপাঠীরাও বিক্ষোভ করেন। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত ওই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নিতে অ্যাম্বুলেন্স দেরিতে আসায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। চিকিৎসাসেবার ঘাটতির প্রতিবাদে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। এর আগে ১৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের পদত্যাগের দাবিতে কয়েক বছরের মধ্যে বড় বিক্ষোভ হয়। কলম্বিয়ায় বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলার অভিযোগ উঠেছে।
জার্মানিতে আগামী ৩১ অক্টোবর ২১টি শহরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে তরুণদের সংগঠন ‘জেন জেড রেগেল্ট’। শিক্ষা খাতে ব্যয় সংকোচন, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য ও বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরুদ্ধে এই কর্মসূচি। আয়োজকেরা আশা করছেন, হাজারো মানুষ অংশ নেবেন। দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। পুলিশের আশঙ্কা, উগ্রপন্থী গোষ্ঠী বিক্ষোভকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে আয়োজকেরা জানিয়েছেন, মানুষ বা সম্পত্তির বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতার বিরোধী তাঁরা।
সব মিলিয়ে বিক্ষোভের কারণ ভিন্ন হলেও কিছু মিল স্পষ্ট। জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি সেবার মান, জবাবদিহির অভাব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে অসন্তোষ প্রায় সবখানেই ফিরে আসছে। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সামনে থাকছেন। ইউরোপের বাইরেও এই ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে। তবে বিক্ষোভ যেখানে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরে গড়াচ্ছে, সেখানে মূল দাবি আড়ালে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

