জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ ঘিরে গত সপ্তাহে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এর আঁচ থেকে রক্ষা পায়নি প্যারিসে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের বেশ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও। নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় এখন ব্যবসা ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় আছেন বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও সাধারণ প্রবাসীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে শনিবার সারা দেশে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে ফরাসি সরকার।
গত সপ্তাহের বিক্ষোভ চলাকালে প্যারিসে হাসান নামের এক প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর মোবাইল ফোনের সরঞ্জাম ও ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকানে ভাঙচুর চালিয়ে সব মালামাল লুট করা হয়। তাঁর দাবি, দোকানে প্রায় ৯০ হাজার ইউরো মূল্যের পণ্য ছিল এবং তার পুরোটাই হাতছাড়া হয়েছে। এতে তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় মানি ট্রান্সফার ও মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশিরাও রয়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। রিয়া ও মানিগ্রামের মতো আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের ছোট ছোট আউটলেট চালান এমন উদ্যোক্তারা বলছেন, রাস্তায় আবার সহিংসতা শুরু হলে তাঁদের দোকান হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাঁদের ভাষ্য, অতীতের আন্দোলনেও এ ধরনের আর্থিক লেনদেনের দোকান তুলনামূলক বেশি লুটের শিকার হয়েছিল। ফলে ঝুঁকির আশঙ্কা তাঁদের কাছে অমূলক নয়।
ক্ষয়ক্ষতির বিস্তৃতি বোঝা যায় সরকারি পরিসংখ্যানে। প্যারিস নগর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ ও ১৮ অক্টোবরের সহিংসতায় ২১ অক্টোবর পর্যন্ত শুধু রাজধানীতেই ৪৫১টি দোকানে ভাঙচুর হয়েছে। ফরাসি সরকারের হিসাবে সারা দেশে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কয়েক হাজার। তবে এর মধ্যে বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক হিসাব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
প্যারিসে ইউনিয়ন মার্টের স্বত্বাধিকারী এলান খান চৌধুরী বলেন, চলমান অস্থিরতায় ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। দোকানপাটের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে। তবে তিনি আশা করছেন, খুব দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরবে।
ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাধারণ প্রবাসী কর্মীরাও পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। প্যারিসে খাবার সরবরাহের কাজ করেন মনির হোসেন। তাঁর ভাষ্য, আন্দোলনের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থায় খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে তাঁদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নিরাপত্তা নিয়েও প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে তাঁদের।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন বৈধ কাগজপত্র ছাড়া থাকা প্রবাসীরা। প্যারিসে দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন এমন একজনের বক্তব্য, চারদিকে পুলিশের কড়াকড়ি আর কাগজপত্র যাচাইয়ের কারণে কাজে বের হওয়াই এখন কঠিন হয়ে গেছে। এতে তাঁদের আয়ের পথও কার্যত বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে ফ্রান্সের স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। ফ্রেঞ্চ ফেডারেশন অব কমার্স অ্যাসোসিয়েশনস ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ ও সহায়তার কাজ শুরু করেছে। কনফেডারেশন অব ফ্রেঞ্চ কমার্স ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও কর্মীদের প্রতি সংহতি জানিয়েছে। অন্যদিকে প্যারিস ও ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বিমার কাগজপত্র তৈরি, ক্ষতিপূরণের আবেদন ও প্রশাসনিক সহায়তা দিচ্ছে।
সরকারের ঘোষিত সহায়তা প্যাকেজেও রয়েছে একাধিক সুবিধা। এর মধ্যে আছে নির্দিষ্ট শর্তে কর্মীদের আংশিক বেকার ভাতার ব্যয় রাষ্ট্রের বহন, কর ও সামাজিক অবদানের অর্থ পরিশোধের সময় বাড়ানো, সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ইউরো পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ এবং যোগ্য ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য বিশেষ তহবিল। এসব সুবিধা যাতে প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা সহজে পান, সে জন্য ফ্রান্সের বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সংগঠন ও কমিউনিটি নেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
বিক্ষোভের পটভূমিও জানা দরকার। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা সমস্যা নিয়ে অসন্তোষ থেকে রাস্তায় নেমেছে শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠন সিজিটি এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের কর্মীরা। গত সপ্তাহের সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে শনিবারের বিক্ষোভের জন্য নেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।
এর মধ্যে শুক্রবার প্যারিসের পশ্চিমাঞ্চলের ট্রাপ ও লা ভেরিয়েরে এলাকায় গুলিতে একজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। ঘটনাটির তদন্তে সন্ত্রাসবিরোধী কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। তবে চলমান বিক্ষোভের সঙ্গে এর সরাসরি কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
নিরাপত্তার স্বার্থে শনিবার প্যারিসের বিশ্বখ্যাত লুভর জাদুঘর, মিউজিয়াম দ’র্সে, পিকাসো জাদুঘর ও গ্রঁ পালে দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্যারিসের কিছু এলাকা এবং অন্যান্য শহরের স্পর্শকাতর স্থানে চলাচলে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বিশেষ করে বাস্তিল, রিপাবলিক, নাসিওঁ ও লে আল এলাকায় সাবধানে চলাচলের কথা বলা হয়েছে। যাঁদের কাজের প্রয়োজনে বাইরে যেতে হয়, তাঁদের যাত্রার আগে গণপরিবহনের হালনাগাদ তথ্য ও পুলিশের নির্দেশনা জেনে নিতে বলা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিক্ষোভের কেন্দ্র ও বড় জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং বিদেশি নাগরিকদের বৈধ কাগজপত্র সঙ্গে রাখার তাগিদও দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বিক্ষোভের সুযোগে লুট হওয়া কোনো পণ্য কেনাবেচা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। ফরাসি দণ্ডবিধি অনুযায়ী, চোরাই বা অপরাধলব্ধ পণ্য কেনা, নিজের কাছে রাখা কিংবা বিক্রি করা গুরুতর অপরাধ। এমন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৩ লাখ ৭৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। প্রবাসীদের জন্য এ সতর্কতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাঁদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
সব মিলিয়ে ফ্রান্সের এই অস্থিরতা শুধু স্থানীয় রাজনীতির বিষয় থাকেনি; এর প্রভাব পড়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবিকা ও নিরাপত্তায়ও। শনিবারের বিক্ষোভ কেমন যায়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে প্রবাসী ব্যবসায়ী ও কর্মীদের সামনের দিনগুলোর অনিশ্চয়তা কতটা কাটবে।

