ভারতের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (এসবিআই) গ্রাহকদের সংবেদনশীল তথ্য চুরির দাবি করেছে সিরিউসিম নামের একটি হ্যাকার গোষ্ঠী। প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর ঘটনাটি আংশিক স্বীকার করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তারা জানিয়েছে, যাঁদের তথ্য এই ঘটনায় প্রভাবিত হয়েছে, তাঁদের ইতিমধ্যে ই-মেইল ও হোয়াটসঅ্যাপে বিষয়টি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকটির আশ্বাস, গ্রাহকদের জমা টাকা ও মূল ব্যাংক হিসাব সম্পূর্ণ নিরাপদ আছে।
বিষয়টি প্রথম সামনে আনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সক্রিয় সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান সাইবারপালস৫৬। তাদের দাবি অনুযায়ী, এসবিআইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার নথি এবং গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়েছে। চুরি হওয়া তথ্যের তালিকায় আছে গ্রাহকদের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর। এর পাশাপাশি ঋণের আবেদন ও হিসাব খোলার নথিসহ বিপুলসংখ্যক পিডিএফ ও অন্যান্য ফাইলের কথাও বলা হয়েছে। এই দাবির পরপরই ব্যাংকটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে এবং হামলার সত্যতা যাচাই করছে।
তবে ব্যাংকের বিবৃতি ও হ্যাকার গোষ্ঠীর দাবির মধ্যে পার্থক্য আছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি আংশিক স্বীকার করলেও ফাঁস হওয়া নথির সংখ্যা বা ক্ষতির পরিধি নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। অর্থাৎ ৩ লাখ ৮০ হাজার নথির যে দাবি করা হচ্ছে, তা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি গভীর উদ্বেগের। হ্যাকাররা সরাসরি গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা সরানোর সুযোগ পায়নি, এটা কিছুটা স্বস্তির খবর। কিন্তু এতে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটছে না। ফাঁস হওয়া নথি ব্যবহার করে প্রতারকেরা অন্যের পরিচয় চুরি করতে পারে। ভুয়া পরিচয়ে ঋণের আবেদন করা কিংবা ব্যক্তিগত আর্থিক প্রতারণার মতো অপব্যবহারের বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর আর হিসাব খোলার নথি একসঙ্গে পেলে প্রতারকদের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য ফাঁদ পাতা সহজ হয়ে যায়। ফোন বা বার্তার মাধ্যমে ব্যাংক কর্মকর্তা সেজে গ্রাহককে ঠকানোর ঘটনাও বাড়তে পারে।
ঘটনার মূল উৎস খুঁজে বের করতে বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। তাঁরা দেখছেন, এসবিআইয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় অননুমোদিত অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না। নাকি তথ্য অন্য কোনো মাধ্যম বা তৃতীয় পক্ষের সূত্রে বেরিয়ে গেছে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া বাকি। এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে ঘটনাটি কতটা গুরুতর এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নিতে হবে।
এসবিআইয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এবং ভারতের প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশটির ৫০ কোটির বেশি মানুষ এই ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত। দেশের সাধারণ মানুষের বড় অংশের প্রাথমিক ব্যাংক হিসাব এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানেই। ব্যাংকিং খাতে মানুষের আস্থা সবচেয়ে বেশি এখানেই। তাই এসবিআইয়ের ব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় ঘটলে তার প্রভাব ভারতের সামগ্রিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক লেনদেনে গভীরভাবে পড়তে পারে।
এ ঘটনা আরও বেশি প্রশ্ন তুলছে সময়ের কারণে। চলতি বছর ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক সাইবার সুরক্ষায় বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এর পরও দেশের বৃহত্তম ব্যাংকের তথ্য ফাঁসের দাবি উঠায় আর্থিক খাতের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেবল নিয়ম বাড়ালেই যে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, বরং তার বাস্তব প্রয়োগ ও নিয়মিত নজরদারিও সমান জরুরি, বিশ্লেষকেরা সে বিষয়টিই সামনে আনছেন।
আপাতত গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে জরুরি সতর্কতা হলো, অচেনা ফোনকল, ই-মেইল বা বার্তায় ব্যক্তিগত তথ্য, ওটিপি কিংবা পাসওয়ার্ড কাউকে না দেওয়া। ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগ এলে তা সরকারি মাধ্যমে যাচাই করে নেওয়াও নিরাপদ। তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার প্রকৃত পরিধি স্পষ্ট হবে না। সেদিকেই নজর রাখছেন ব্যাংকিং ও প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা।

