আট দশকের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর নানা অনিশ্চয়তার অধ্যায় পেরিয়ে অবশেষে নতুন দিগন্তে ডানা মেলছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি। রোববার পশ্চিম সিডনির ব্যাজেরিস ক্রিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করছে দেশটির দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ‘ওয়েস্টার্ন সিডনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ (ন্যান্সি-বার্ড ওয়ালটন)। পাঁচ দশকের বেশি সময় পর অস্ট্রেলিয়ায় সম্পূর্ণ নতুন কোনো প্রধান বিমানবন্দর চালুর এই ঘটনা দেশটির আকাশপথের যোগাযোগে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সিডনির কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ৪৪ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই বিমানবন্দর চালু হচ্ছে ২৪ ঘণ্টা পরিচালনার সুবিধা নিয়ে। সিডনির বর্তমান প্রধান ও একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ফ্লাইট চলাচলে যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, নতুন বিমানবন্দরে তা থাকছে না। ফলে গভীর রাত থেকে ভোর—দিনের যেকোনো সময় আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ওঠানামার সুযোগ তৈরি হবে। এতে সিডনির আকাশপথের যোগাযোগে নতুন গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথম পর্যায়ে ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রানওয়ে ও সমন্বিত টার্মিনাল নিয়ে যাত্রা শুরু করছে বিমানবন্দরটি। এই রানওয়েতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ এয়ারবাস এ৩৮০ ওঠানামা করতে পারবে। বছরে এক কোটি যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ভবিষ্যতে দ্বিতীয় রানওয়ে নির্মাণ ও টার্মিনাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই সক্ষমতা আট কোটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিমানবন্দরটির অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে প্রচলিত ধরনের কোনো এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার নেই। এর পরিবর্তে সম্পূর্ণ ডিজিটাল রিমোট ব্যবস্থার মাধ্যমে উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থাকে বিমানবন্দরটির বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আট দশকের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান
সিডনিতে দ্বিতীয় বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৪৬ সালে, তৎকালীন লেবার সরকারের আমলে। এরপর ১৯৮৬ সালে আবার লেবার সরকারের সময় ব্যাজেরিস ক্রিকে ১ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও টানাপোড়েনে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন আটকে থাকে বছরের পর বছর।
অবশেষে ২০১৪ সালে লিবারেল জোট সরকারের আমলে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয় পুরোদমে নির্মাণকাজ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এবার আবার লেবার সরকারের আমলেই বিমানবন্দরটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমের নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে। এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে এখানে মালবাহী বা কার্গো ফ্লাইট চালু হয়েছিল। এবার শুরু হচ্ছে নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলাচল।
যাত্রীসেবায় দেশি-বিদেশি উড়োজাহাজ সংস্থা
প্রথম পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ রুটে সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করবে বাজেট এয়ারলাইন জেটস্টার। আন্তর্জাতিক রুটে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিয়েছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, এয়ার নিউজিল্যান্ড ও ভিয়েতজেট। ২০২৭ সাল নাগাদ কোয়ান্টাস ও কাতার এয়ারওয়েজও বিমানবন্দরটি থেকে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করবে বলে পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব উড়োজাহাজ সংস্থার কার্যক্রম শুরু হলে নতুন বিমানবন্দরটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ২৪ ঘণ্টা ফ্লাইট পরিচালনার সুবিধা বিমান সংস্থাগুলোর সময়সূচি নির্ধারণে বাড়তি সুযোগ তৈরি করবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও স্বস্তির খবর
নতুন বিমানবন্দর চালু হওয়ায় পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম সিডনিতে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। শহরের ওই অংশে বসবাসকারী যাত্রীদের জন্য নতুন বিমানবন্দরটি যাতায়াতের বিকল্প সুযোগ তৈরি করবে।
তবে বিমানবন্দরটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে যাতায়াতব্যবস্থা। দ্রুতগতির রেলসংযোগ পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দরে যাত্রীদের যাতায়াতে গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সিডনির কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ৪৪ কিলোমিটার দূরত্বও যাত্রীদের কাছে বিমানবন্দরটির আকর্ষণ ও কার্যকারিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি বিবেচ্য বিষয়।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারলে নতুন বিমানবন্দরটি শুধু সিডনির আকাশপথের যোগাযোগেই নয়, পুরো নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
অবকাঠামোয় বিনিয়োগ ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি
নতুন বিমানবন্দর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে মেট্রোরেল, মোটরওয়ে ও অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে ফেডারেল সরকার এবং নিউ সাউথ ওয়েলস (এনএসডব্লিউ) সরকারের সম্মিলিত বিনিয়োগ ২৫ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা।
দীর্ঘ আট দশকের পরিকল্পনা, রাজনৈতিক বিতর্ক ও নির্মাণযজ্ঞের পর নতুন এই বিমানবন্দরের যাত্রা সিডনির যোগাযোগব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। ২৪ ঘণ্টা ফ্লাইট পরিচালনা, আধুনিক ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক যাত্রী সামলানোর পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে বিমানবন্দরটি অস্ট্রেলিয়ার পরিবহন অবকাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে যাচ্ছে।

