মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকেরা দূতাবাস থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরান সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে। অঞ্চলটির আরব ও মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার কখন ইরানে হামলা শুরু করবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে আক্রমণ চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন-সংশ্লিষ্ট বিপুল বিনিয়োগের তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো, জ্বালানি স্থাপনা এবং বিমানবন্দরে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। ফলে যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্বের আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টদের প্রশাসনে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক আলোচক হিসেবে কাজ করা অ্যারন ডেভিড মিলার মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘উত্তেজনা বাড়বেই। সেটি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হোক কিংবা পরে, তা প্রাসঙ্গিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, উত্তেজনা বাড়ানোর উদ্দেশ্য কী।’
এপ্রিলে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি লড়াই অনেকটাই থেমে যায়। তবে বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে জুনে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে কোনো পক্ষই এগোয়নি। ওই সমঝোতায় ইরানকে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে এসব ছাড় মেনে নেওয়া কঠিন।
মিলারের ভাষায়, ‘দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে, যা কার্যত মহাকাশের মতো বিস্তৃত। হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক কর্মসূচি কিংবা হুতিদের বিষয়ে ইরান তার অবস্থান এমনভাবে বদলাবে না, যাতে ট্রাম্প নিজের মতো করে বিজয়ের দাবি করতে পারেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এরই মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিপাবলিকান সিনেটর ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র রিক স্কট বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন নিশ্চিত করতে আমাদের এ বিষয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজও বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য প্রস্তুত হোয়াইট হাউস। শুক্রবার প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ইরানের বন্দরগুলোতে এই অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও মার্কিন নৌবাহিনী সুদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত বজায় রাখতে পারবে।’
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দুর্বল করার লক্ষ্যে হামলা চালানোর দাবি দিয়ে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা এখন মধ্যপ্রাচ্যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিয়েছে। কে এই অঞ্চলের নিয়ম নির্ধারণ করবে, তা নিয়েই মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্ব আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
এর একটি বড় উদাহরণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে বিরোধ। প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায় করতে চায় ইরান। এ নিয়ে জলপথটিতে দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলাও চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করেছে, যা দেশটির অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে, প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালিয়ে পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে ইরান।
শুধু চলতি অক্টোবরেই অন্তত ২৭টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। মার্চের পর কোনো এক মাসে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা বলে জানিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর সংবাদমাধ্যম ইউএসএনআই নিউজ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে ইয়েমেনেও। দেশটিতে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী এবং সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো পক্ষের জন্যই সন্তোষজনক নয়। আবার কেউই নিজেদের এতটা দুর্বল মনে করছে না যে বড় ধরনের ছাড় দেবে। এ কারণে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
তেলের বাজারে দুই পক্ষের দুই হিসাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষই তেলের বাজার পর্যবেক্ষণ করছে, তবে বাজারের গতিপ্রকৃতি থেকে তারা ভিন্ন শিক্ষা নিচ্ছে। ভূরাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্বালানি ও ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি ব্রিউ মিডল ইস্ট আইকে এ কথা বলেন।
চলতি সপ্তাহে জ্বালানিবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রকাশিত উপাত্তে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের রপ্তানি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে ফিরে গেছে। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, সাময়িকভাবে রপ্তানি বেড়ে যাওয়ায় উপাত্তে প্রকৃত পরিস্থিতির পুরো চিত্র প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বেশি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে আসছে। বিপরীতে, মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন বাব আল-মান্দেব প্রণালি এড়িয়ে সৌদি আরব লোহিত সাগরের পথ ব্যবহার করে তেল রপ্তানি করছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালির ভেতরে অবস্থিত উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পদ্ধতিতে তেল পরিবহন করছে। এসব দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজে করে তেল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ওমান উপসাগরে অপেক্ষমাণ বড় ট্যাংকারে। মার্কিন নৌবাহিনী এসব জাহাজকে পাহারা দিচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে এ ব্যবস্থার ব্যয়ও অনেক বেশি।
রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও তেলের দাম কমেনি। ইরানের সঙ্গে জুনে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে, পেট্রলের দাম বেড়েছে ১০ শতাংশের কম।
ইরানের অর্থনীতি যে বড় চাপের মধ্যে রয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সেপ্টেম্বরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ব্রিউয়ের মতে, ইরানের শাসকেরা মনে করছেন, তাঁরা আরও এক দফা যুদ্ধের চাপ সহ্য করতে পারবেন; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন।
ব্রিউ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে কতটা তেল পরিবহন হচ্ছে, তা দেখে, তাহলে ইরান দেখছে তেলের দাম কত। ইরানের নেতারা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী যে ট্রাম্পের তুলনায় তারা দীর্ঘ সময় ধরে চাপ সহ্য করতে পারবেন।’
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার সরাসরি ইরানে হামলা শুরু করলে জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের পাল্টা আক্রমণ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে জাহাজ চলাচল সচল রাখতে পাহারার যে ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তুলেছে, সেটি পরিচালনার সক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
ব্রিউয়ের ভাষায়, ‘জ্বালানির দাম উঁচু পর্যায়েই থাকবে।’
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর আগে কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সেই হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল। যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানে হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দেয়। পরে সৌদি আরবের অবস্থানে পরিবর্তন আসে এবং রিয়াদ মধ্যস্থতার উদ্যোগে সমর্থন জানায়। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ইরানের হামলা বন্ধ করতে দেশটিকে অর্থ দিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলে উপসাগরীয় দেশগুলো কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে ইরানের পাল্টা হামলার সম্মুখসারিতে থাকতে হবে তাদের। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান এসব দেশের ওপর হাজার হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল।
ওমানের শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ বাবুদ বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি হবে ভয়াবহ। ইতিমধ্যে আমরা সেখানে গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যা দেখতে পাচ্ছি।’
আশার্ক ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবনতি সামাল দিতে বাহরাইনকে সহায়তা করার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বে একটি আর্থিক উদ্ধার প্যাকেজ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। কাতারের অর্থনীতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতি ৪ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। এদিকে, হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরবকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলন বাতিল করতে হয়েছে।
বাবুদ বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চল এমন এক সংকটের জিম্মি, যার শেষ দেখা যাচ্ছে না। কাতার মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। ট্রাম্প ওমানকে কার্যত এক পাশে ঠেলে দিয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও সৌদি আরব খুব একটা কথা বলছে না। তারা বুঝতেই পারছে না কী করা উচিত। ট্রাম্পের অবস্থানও তারা বুঝতে পারছে না।’
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষণাবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জর্ডানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারওয়ান মুয়াশের মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ইসরায়েল ছাড়া আর কোনো পক্ষেরই যুদ্ধকে গুরুতরভাবে চালিয়ে যাওয়ার প্রকৃত স্বার্থ নেই।’
নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কার মধ্যেই আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্প ইরানে নতুন হামলার সম্ভাবনা আরও জোরালো করেছেন। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান ‘শেষ করতে’ সহায়তা চান বলে জানিয়েছেন, যদি না তেহরান দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলে যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন থাকায় নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। নির্বাচন অনির্ণায়ক হলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তাঁকে ক্ষমতায় টিকে থাকতেও সহায়তা করতে পারে।
বাবুদের মতে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অবকাঠামোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম—এ নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানও উপসাগরীয় দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করার সক্ষমতা রাখে।
এদিকে, চলতি সপ্তাহে ড্রপসাইট নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাই স্পষ্ট করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার যুদ্ধ শুরু করলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলো ইরানের হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল যদি হয় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা, হরমুজ প্রণালি থেকে সৃষ্ট চাপ সামাল দিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ব্যবহার করা এবং ইরানের ওপর অবরোধ বজায় রাখা, তাহলে ওই দেশগুলোর সরকারগুলোর মনে করা উচিত নয় যে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নিয়েও তারা ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারবে।’
ট্রাম্পের ওপর চাপ কতটা পড়বে?
যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠবে, ইরানের সম্ভাব্য আরও তীব্র হামলা থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের কতটা রক্ষা করতে পারবে। এমন হামলা জ্বালানির দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ইন্সপেক্টর জেনারেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু গোলাবারুদের ক্ষেত্রে দেশটির কৌশলগত মজুতে ঘাটতি রয়েছে। এর আগে মার্চে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছিল, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার জন্য ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টরের মজুতেও ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। এরপর অঞ্চলটিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে উচ্চমাত্রার সংঘাত চলেছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন বারবার দাবি করেছে, তাদের গোলাবারুদের ঘাটতি নেই।
ইরানের ড্রোন হামলার মুখে উপসাগরীয় দেশগুলোর দুর্বলতা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবে হুতিদের হামলার মধ্য দিয়ে আরও স্পষ্ট হয়েছে। দেশটির বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে বারবার হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরু থেকে দেশটির বিমানবন্দরগুলোতে হুতিদের হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ধর্মীয় তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের বলে ধারণা করা একটি হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মুয়াশেরের মতে, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সংকট আরও বাড়বে, অথচ এতে ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, ‘এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়ায় অভ্যন্তরীণভাবে চাপে পড়ছেন ট্রাম্প।’
তবে কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক মিলারের মতে, ট্রাম্পের ওপর চাপের প্রভাব যতটা ভাবা হয়, বাস্তবে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংযম ততটা নাও থাকতে পারে। বিশেষ করে বছরের শুরুতে দ্রুত বিজয়ের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ইরানের প্রতি তাঁর ক্ষোভ রয়েছে।
মিলার বলেন, ‘এখানে লাভ-ক্ষতির কোনো হিসাব কাজ করছে না, কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিকই থাকবেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে তিনি প্রতিনিধি পরিষদ, এমনকি সিনেটও হারাতে পারেন, কিন্তু তাতে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কিছু হবে না। তাঁর পরিবারও ভালো থাকবে। তিনি তাঁর প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরি তৈরি করবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সংঘাত শেষ করার জন্য ট্রাম্পের তাড়াহুড়ো আছে—এমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। কোনো জবাবদিহি নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপটা কোথায়?’
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব শুধু ইরান বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন, উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি, বৈশ্বিক তেলের দাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। তবে সংঘাত আবার শুরু হবে কি না, হলে তার পরিসর কতটা বিস্তৃত হবে—তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।

