মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কার মধ্যে সেখান থেকে কিছু কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দ্রুত সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একাধিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। যাঁদের এখন সরানো হচ্ছে, তাঁদের অনেকেই ইরান যুদ্ধের চরম উত্তেজনার সময় প্রত্যাহারের নির্দেশ পেয়েছিলেন। মাত্র কিছুদিন আগে তাঁরা নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরেছিলেন। ফলে এই প্রস্থানকে একটি হতাশাজনক ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে দেওয়া ২৩ অক্টোবরের একটি আনক্ল্যাসিফায়েড মেমোতে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মীদের নিশানা করার তৎপরতা ইরান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। মেমোতে আরও বলা হয়েছে, তাদের এই ষড়যন্ত্রের চেষ্টা মধ্যপ্রাচ্য ও নির্দিষ্ট কিছু দেশে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। মেমোর বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যম এক্সিওস।
এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, দূতাবাসে কর্মী মোতায়েনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিস্থিতির নতুন তথ্য সার্বক্ষণিক মূল্যায়ন করা হয়। হুথি হামলার হুমকি এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রের তথ্যের ভিত্তিতেই এ অঞ্চলে ‘রেসট্রিক্টেড অপারেশনস’ মর্যাদায় থাকা দূতাবাসগুলোর কর্মী সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলা বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই রদবদল হচ্ছে। এসব হামলা নিয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্ট বারবার সতর্ক করেছে যে সংঘাত তাৎক্ষণিক এলাকার বাইরেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। সূত্রগুলো জানিয়েছে, দ্রুত পদক্ষেপের জন্য ইসরায়েল জোরালো তদবির করলেও আপাতত তা সফল হয়নি।
চলতি সপ্তাহে সৌদি আরব থেকে জরুরি দায়িত্বে নেই এমন কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সব সদস্যকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট। কর্মকর্তারা বলছেন, হুথিদের তৎপরতা বৃদ্ধির জবাবেই এই নির্দেশ।
একই সময়ে জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবাননসহ আরও কয়েকটি দূতাবাসে অত্যন্ত নীরবে কর্মীসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা সমন্বয় করা হচ্ছে বলে সিএনএনকে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র। স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, লেবানন, আমিরাত, কাতার ও জর্ডানে সীমাবদ্ধ কার্যক্রমের আওতায় কর্মীদের উপস্থিতিতে অস্থায়ী পরিবর্তন আনা হবে। কুয়েত বা বাহরাইনের কর্মীদের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। এতে ধারণা করা যায়, সেখানে কর্মীর সংখ্যা নির্ধারিত সীমার বেশি নয়।
সৌদি আরবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হলেও অন্য দূতাবাসগুলো থেকে কর্মী সরানোর বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি। স্টেট ডিপার্টমেন্ট জোর দিয়ে বলেছে, সৌদি আরবের মতো এই দূতাবাসগুলোর মর্যাদায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। সেগুলো আগের মতোই ‘রেসট্রিক্টেড অপারেশনস’ মর্যাদায় আছে। তবে আনুষ্ঠানিক মর্যাদা না বদলালেও এর ভেতরে থেকেই কর্মীসংখ্যায় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কূটনীতিকদের পরিবারগুলোর ওপর। এক মার্কিন কূটনীতিকের ভাষ্য, পরিস্থিতিকে শুধু বিশৃঙ্খল বললে কম বলা হবে। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরো পরিবার সরিয়ে নেওয়ার জন্য এ পর্যন্ত যে আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা পুরো খরচের জন্য যথেষ্ট নয়। যুদ্ধের শুরুর সপ্তাহগুলোতে অনেক পরিবারকে সন্তানদের জন্য নতুন বাড়ি ও স্কুল খুঁজতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। এখন আরও কম সহায়তা পাওয়ার আশঙ্কা নিয়েই তাঁদের আবার একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র নিকি গেমার বলেন, এটি বছরের শুরুর সেই বিশৃঙ্খলারই পুনরাবৃত্তি। অনেকে সবে থিতু হতে শুরু করেছিলেন, এর মধ্যেই আবার চলে যাওয়ার নির্দেশ এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা হতাশ, বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ।
সব দূতাবাসে সন্তানদের ফিরতে দেওয়া না হলেও বেশির ভাগ জায়গায় জীবনসঙ্গীদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি ছিল। এখন সেই পরিবারের সদস্যরাই আবার দূতাবাসগুলো ছেড়ে যাচ্ছেন। সূত্রগুলো জানায়, বছরের শুরুর মতো এবার একই রকম আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না।
জর্ডানের রাজধানী আম্মানে দূতাবাসের কর্মীদের এক সূত্র বলেছেন, সেখানে সবকিছুতেই বারবার একই ঘটনা ঘটার অনুভূতি কাজ করছে। প্রত্যাহারের বিষয়ে অবগত আরেকটি সূত্র জানায়, ফগি বটমে স্টেট ডিপার্টমেন্টের সদর দপ্তর থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় ইরান যুদ্ধের শুরুর মতোই চরম বিশৃঙ্খল। যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার জন্য পরিবারগুলো দৈনিক ভাতা পাবে কি না, তা নিয়েও কর্মকর্তাদের উদ্বেগ ছিল। সাধারণত প্রস্থানের আগে যে পরিকল্পনা বৈঠক বা টাউন হল সভা হয়, কিছু দূতাবাসে তাও হয়নি। অনেকে নিজ কর্মস্থলের নেতৃত্বের কাছ থেকে না জেনে সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছেন।
কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়ন আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (এএফএসএ) ‘আমলাতান্ত্রিক ঠেলাঠেলির’ বিবরণ শুনতে পাচ্ছে বলে জানিয়েছে। গত বৃহস্পতিবারের এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, মাত্র কিছুদিন আগে কর্মস্থলে ফিরে সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করানো পরিবারগুলোকে কত আর্থিক সহায়তা মিলবে, সে বিষয়ে কোনো পরামর্শ ছাড়াই আবার সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে। সৌদি আরবের বাইরের পরিবারগুলো সংগঠনকে জানিয়েছে, আবাসন সহায়তা বা দৈনিক ভাতা নিশ্চিত না করেই তাঁদের চলে যেতে বলা হচ্ছে। তাঁদের বলা হয়েছে, দূতাবাসগুলোর মর্যাদায় পরিবর্তন না আসায় এই সহায়তা মিলছে না।
বিদেশে হঠাৎ বাসস্থান হারানোর অপ্রত্যাশিত খরচ মেটাতে এবং নতুন বাড়ি খুঁজতে পরিবারগুলো মূলত এসব ভাতার ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে যখন পরিবারের কূটনীতিক সদস্য জরুরি কর্মী হিসেবে দূতাবাসে থেকে যান, তখন এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। গেমার বলেন, বিমানে ওঠার আগেই পরিবারগুলোর জানার অধিকার আছে, তারা বাসস্থানের খরচ কীভাবে মেটাবে।
শুক্রবার স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সব কর্মী ও তাঁদের পরিবার দৈনিক ভাতা এবং বাসস্থান ও স্কুলের জন্য সহায়তা পাচ্ছেন। এই সহায়তা সংশ্লিষ্ট দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য নির্ধারিত সরকারি হারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বলেও তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, সীমাবদ্ধ কার্যক্রম, অনুমোদিত প্রস্থান কিংবা বাধ্যতামূলক প্রস্থানের আওতায় থাকা কূটনৈতিক কর্মী ও তাঁদের পরিবারের জন্য পরিস্থিতি কতটা কঠিন, তা তাঁরা বোঝেন। অতিরিক্ত খরচ ও স্কুলে ভর্তিসহ এই কঠিন সময় পার করতে পরিবারগুলোকে সহায়তার সব উপায় ব্যবহারে তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ। ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও বিস্তারিত জানানো হবে।
সরকারি বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের কূটনীতিকদের অভিজ্ঞতার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। অথচ ইউনিয়ন ও পরিবারগুলো বলছে, নির্দিষ্ট পরিমাণ বা নিশ্চয়তা ছাড়াই তাঁদের সরে যেতে বলা হয়েছে। এই ফারাকের একটি কারণ হতে পারে দূতাবাসগুলোর আনুষ্ঠানিক মর্যাদা না বদলানো। মর্যাদা না বদলালে সংশ্লিষ্ট সুবিধার আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে, যা পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।
নীরবে কর্মী সরানোর কৌশলও লক্ষণীয়। প্রকাশ্যে প্রত্যাহার ঘোষণা করলে উত্তেজনা বাড়তে পারে, আবার না করলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সেই বিভ্রান্তিই এখন দেখা যাচ্ছে। অনেকে নেতৃত্বের কাছ থেকে নয়, খবরের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জেনেছেন। এতে প্রশাসনিক সমন্বয় ও কর্মীদের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বৃহত্তর দৃষ্টিতে এই পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয়, ওয়াশিংটন ইরান ও তার মিত্রদের পাল্টা হামলার ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ট্রাম্পের হামলা পুনরায় শুরুর ইঙ্গিত এবং হুথিদের বাড়তি তৎপরতা মিলিয়ে অঞ্চলটিতে উত্তেজনা নতুন মোড় নিতে পারে। তবে হামলা কবে ও কীভাবে হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারগুলোকে বারবার স্থানান্তরের ধকল সামলাতে হচ্ছে, যার মানবিক ও আর্থিক মূল্য কম নয়।

