উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন দেশটির নেতা কিম জং উন। এ লক্ষ্য অর্জনে সেনাদের প্রশিক্ষণ জোরদার, প্রতিটি ইউনিটের যুদ্ধক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামরিক প্রযুক্তির উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একই সময়ে চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ে কিমের সম্ভাব্য উপস্থিতির খবর সামনে আসায় দেশটির সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২৪ অক্টোবর ২০২৬ উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি জানায়, পিয়ংইয়ংয়ে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অনুষ্ঠিত সেনাবাহিনীর কোম্পানি কমান্ডারদের দুই দিনের সম্মেলনে কিম এই নির্দেশ দেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্মেলনে কিম ‘কোরীয় ধাঁচের সামরিক বিপ্লব’ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তিনি এমন একটি পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন, যার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে পারে।
কিমের নির্দেশনায় সেনাবাহিনীর প্রতিটি কোম্পানিকে সামরিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির দিক থেকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ, শুধু অস্ত্রের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং সেনাদের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকারিতা উন্নত করাও দেশটির সামরিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
কেন সামরিক শক্তি বাড়াতে চাইছে উত্তর কোরিয়া?
উত্তর কোরিয়ার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির এই উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন কোরীয় উপদ্বীপে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এখনো কাটেনি। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের অবনতি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ এবং পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ—সব মিলিয়ে পিয়ংইয়ংয়ের নিরাপত্তানীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতাসীন দলের কংগ্রেসে কিম প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। সাম্প্রতিক সেনা সম্মেলনকে সেই বৃহত্তর সামরিক পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার দৃষ্টিতে, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভাব্য বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর উপায়। তবে দেশটির সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক আধুনিকায়নের প্রতিটি পদক্ষেপের প্রভাব কেবল উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ নীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অস্ত্র নিয়ে নতুন আলোচনা
সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়া বেশ কয়েকটি অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন ধরনের নির্ভুল লক্ষ্যভেদী টর্পেডো ব্যবস্থা এবং একটি মধ্যম পাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। দেশটির দাবি, এসব অস্ত্রের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
সামরিক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার লক্ষ্য শনাক্তকরণ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং অস্ত্র পরিচালনার কিছু প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে পারে। তবে উত্তর কোরিয়ার পরীক্ষিত অস্ত্রগুলোতে এই প্রযুক্তি ঠিক কীভাবে কাজ করছে এবং সেগুলোর কার্যকারিতা কতটা, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিস্তারিত তথ্য সীমিত।
তবু এসব পরীক্ষা থেকে বোঝা যায়, দেশটি প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনড় পিয়ংইয়ং
জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। দেশটি নিজেদের আইনেও পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের মর্যাদা অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং সরকার বারবার জানিয়েছে, তারা নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ত্যাগ করবে না।
এই অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে জটিল করে তুলেছে। একদিকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা রয়েছে, অন্যদিকে দেশটির সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক প্রস্তাবও সামনে এসেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং গত সেপ্টেম্বরে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ করার দাবি দিয়ে শুরু না করে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত কর্মসূচিটি স্থগিত রাখার বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা করতে পারে। এর বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
তবে এই প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এমন সমঝোতা উত্তর কোরিয়াকে কার্যত পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে, পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ না করেই নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা পেতে পারে দেশটি।
নতুন সেতু দিয়ে চীনে কিমের সম্ভাব্য প্রবেশ
উত্তর কোরিয়ার সামরিক পরিকল্পনার খবরের পাশাপাশি কিম জং উনের চীন সফর নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি সূত্রের বরাতে এএফপি জানিয়েছে, কিম চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ে পৌঁছে থাকতে পারেন। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন নির্মিত নিউ ইয়ালু নদী সেতু ব্যবহার করে তিনি চীনে প্রবেশ করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম ইয়োনহাপও অজ্ঞাতনামা সরকারি সূত্রের বরাতে একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে প্রতিবেদনে তাঁর প্রবেশের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা তথ্য দেওয়া হয়নি।
চার লেনের নিউ ইয়ালু নদী সেতুটির নির্মাণকাজ ২০১৪ সালে শেষ হয়েছিল। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার অংশে সংযোগ সড়ক ও শুল্কসংক্রান্ত অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকায় এটি চালু হতে দীর্ঘ সময় লাগে। প্রায় ১২ বছর পর, গত সপ্তাহে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়।
উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক সমর্থন এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে বেইজিংয়ের ভূমিকা পিয়ংইয়ংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই কিমের সম্ভাব্য সফর নিশ্চিত হলে দুই দেশের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে সেটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করতে পারে।
এই সফরের সম্ভাব্য সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সোমবার বেইজিংয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা, যেখানে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ দেশটির শীর্ষ নেতারা অংশ নেবেন। তবে কিমের সম্ভাব্য সফরের সঙ্গে এই বৈঠকের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা কেন বাড়ছে?
কিমের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির আহ্বানের পাশাপাশি দুই কোরিয়ার সীমান্ত পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক পর্যায়ে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। সীমান্তে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিষ্কার করা এবং দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা পুনরায় চালু করাই ছিল এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
এর আগে দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত অসামরিকীকৃত অঞ্চলে একটি বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকজন সেনা আহত হন। সিউলের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা স্থলমাইন থেকে বিস্ফোরণটি ঘটে। তবে পিয়ংইয়ং অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এ ঘটনায় ক্ষমা চাওয়ার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার আগের দাবিও নাকচ করেছে।
সামরিক আলোচনার প্রস্তাবের বিষয়ে উত্তর কোরিয়া এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
উল্লেখ্য, ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের অবসান হয়েছিল যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে, পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে নয়। ফলে দুই দেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়নি। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা সীমান্ত উত্তেজনাকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে উত্তর কোরিয়া
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকে মস্কোর সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার যুদ্ধপ্রচেষ্টায় সহায়তা দিতে উত্তর কোরিয়া সেনা পাঠিয়েছে। এর বিনিময়ে দেশটি অর্থনৈতিক সুবিধা ও সামরিক প্রযুক্তি পাচ্ছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সম্পর্ক উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়লে পিয়ংইয়ংয়ের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা এবং সামরিক সক্ষমতা উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সহযোগিতার প্রকৃত পরিধি এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের ওপর।
কিম জং উনের সর্বশেষ নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, উত্তর কোরিয়া সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি এবং অস্ত্র উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব অব্যাহত রাখতে চায়। একই সময়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক, রাশিয়ার সহযোগিতা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্য ঘোষণা করলেই উত্তর কোরিয়া বাস্তবে সেই অবস্থানে পৌঁছে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে আসার সুযোগ নেই। সামরিক শক্তি নির্ধারিত হয় শুধু অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে নয়; প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সামর্থ্যও এতে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, উত্তর কোরিয়ার সামরিক পরিকল্পনা এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন করে মনোযোগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, কিমের ঘোষণার পর দেশটি কী ধরনের বাস্তব পদক্ষেপ নেয় এবং একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ সামনে আসে কি না।

