ফ্রান্স থেকে ইতালি, স্পেন থেকে সার্বিয়া, পর্তুগাল থেকে গ্রিস—ইউরোপের বড় একটি অংশে এখন বিক্ষোভের উত্তাপ। রাজপথে নেমেছেন মূলত তরুণেরা, বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা জেন-জি প্রজন্মের সদস্যরা। কোথাও শিক্ষার উচ্চ ব্যয় ও নিম্ন মান, কোথাও আবাসনসংকট, আবার কোথাও জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ তাঁদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। দেশভেদে কারণ আলাদা হলেও সবার মূলে রয়েছে একই অসন্তোষ।
বিক্ষোভের ধরন ও কারণ দেশে দেশে ভিন্ন। ফ্রান্সে আন্দোলনের শুরু শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। শিক্ষকসংকট, বিদ্যালয়ের বেহাল অবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে তাঁরা রাস্তায় নামেন। পরে শিক্ষকদের আন্দোলনেও সমর্থন জানান। বিক্ষোভ ক্রমে সহিংসতা, লুটপাট ও গণগ্রেপ্তারে গড়ায়, ফলে পুরো দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। গত শনিবার প্যারিসসহ মার্সেই, লিওঁ, লিল, অর্লেয়া ও বোর্দোয় আবার মিছিল হয়েছে। শিক্ষার্থী সংগঠন ইউএনইএফের ডাকা প্যারিসের মিছিলে যোগ দেন বড় শ্রমিক সংগঠন সিজিটি, কৃষক, জলবায়ুকর্মী এবং ২০১৮ সালের জ্বালানি-মূল্যবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সদস্যরা। গত সপ্তাহের লুটপাট ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ পুরো সপ্তাহ সতর্ক ছিল।

স্পেনে আন্দোলনের সূত্রপাত একটি ছোট ঘটনা থেকে। ৮৭ বছর বয়সী এক নারীকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার ঘটনা বাড়িভাড়া বৃদ্ধিজনিত আবাসনসংকট নিয়ে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে উসকে দেয়। গত সেপ্টেম্বর থেকে এ আন্দোলন জোরালো হয়। শেষ পর্যন্ত চাপে পড়ে দেশটির সরকার আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছে।
পর্তুগালেও আবাসন প্রশ্নেই রাজপথ গরম। রাজধানী লিসবনের রোসিও চত্বরে চলতি সপ্তাহে প্রতি সন্ধ্যায় হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছেন, কেউ কেউ তাঁবুও টানিয়েছেন। গত মঙ্গলবার ভোরে সেখান থেকে ৫৫ জনকে আটক করা হলে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের পতাকায় লেখা ছিল ‘বসবাসের জন্য বাড়ি চাই’। তাঁদের দাবি, ভাড়াটেকে উচ্ছেদ সহজ করা ও ভাড়া বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ-সংক্রান্ত সদ্য পাস হওয়া নতুন আইন বাতিল করতে হবে।
গ্রিসে হাজারো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এথেন্সসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছেন। পার্লামেন্ট ভবনের সামনে জড়ো হয়ে তাঁরা বিনা মূল্যে সরকারি শিক্ষার দাবি তোলেন। তাঁদের স্লোগানে ফ্রান্সের কথাও উঠে আসে। ইতালির রোমে ৭ অক্টোবর একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের বিবৃতির শুরুতেই লেখা ছিল ‘ফ্রান্সের মতো’। বেলজিয়ামেও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমেছেন।
আলবেনিয়ায় কয়েক মাস ধরে দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে। বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণের একটি পরিকল্পনা থেকে এর শুরু। ওই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে। গত সপ্তাহে সেখানকার বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ চাইলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা দেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য করার পরিকল্পনা ভণ্ডুল করতে চাইছেন। অস্থিরতার জন্য তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও দায়ী করেছেন। এক বিক্ষোভকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেছেন, তাঁরা সমঝোতা নয়, নতুন সরকার চান।
সার্বিয়ায় দুই বছর ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশটির রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। আজ রোববার সেখানে পার্লামেন্ট নির্বাচন হচ্ছে। দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুসিচের জন্য এবারের আন্দোলন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলবেনিয়া ও সার্বিয়ায় বিক্ষোভের অন্যতম দাবি দুর্নীতি দমন, যা এখন অনেকটাই সরকার পতনের দাবির দিকে গড়িয়েছে।
এক দেশের আন্দোলন অন্য দেশের তরুণদের অনুপ্রাণিত করছে। ইতালি ও গ্রিসের বিক্ষোভকারীরা স্লোগানে ফরাসি আন্দোলনকারীদের সংহতি জানিয়েছেন। স্পেনের আবাসন আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছেছে পর্তুগালেও। ইতালির বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, তাঁরা স্পেনের আন্দোলনের দিকে নিবিড় নজর রাখছেন। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী সংগঠন নিজেদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শও বিনিময় করছে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থী সংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ব্রিতো সিএনএনকে বলেন, তিনি দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্যের চেয়ে মিলই বেশি দেখছেন। সবার দাবি শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণদের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জীবনযাত্রা ও আবাসনের খরচ কমানো।
ইতালির ছাত্রনেতা সাবরিনা ব্রিজোলা গত সপ্তাহান্তের এক সমাবেশে বলেন, তাঁরা এমন বিদ্যালয় চান, যেগুলোর ছাদ মাথার ওপর ভেঙে পড়বে না। তাঁরা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কাজ, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার চান।
ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোপিয়ান করেসপনডেন্ট’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিন্টেলমান মনে করেন, বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশা বেরিয়ে আসছে। ইউরোপের রাজনীতি পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, এই অনুভূতিই আন্দোলনে প্রতিফলিত হচ্ছে। তাঁর মতে, শিক্ষা ও আবাসন ছাড়াও ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠা চাকরির বাজার একটি বড় কারণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মজীবনের শুরুর দিকের চাকরি বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। এর সঙ্গে আছে জলবায়ু সংকট। তিনি বলেন, উদার গণতন্ত্রের সেই প্রতিশ্রুতি এখন ভেঙে পড়ছে, যেখানে বলা হতো পরের প্রজন্ম আগের প্রজন্মের চেয়ে ভালো থাকবে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগালে বিক্ষোভের তাপ বেশি। এসব দেশের অর্থনীতি তুলনামূলক দুর্বল এবং জাতীয় ঋণও বেশি। ফলে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো কঠিন। উদাহরণ হিসেবে ফ্রান্সের কথা বলা যায়। গত বুধবার দেশটিতে সরকারি বন্ডের মুনাফার হার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে, যা বাজেটের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
ফ্রান্সে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হয়, গত নয় বছর ধরে এমনটাই দেখা যাচ্ছে। অ্যালিস দ্য ব্রিতোর ভাষ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও ভালো সরঞ্জাম না পেলে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হন। তবে এবার আন্দোলনের পরিসর বেড়েছে। শ্রেণিকক্ষের সংকট কাটানো, শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি উঠেছে। সঙ্গে আছে তরুণদের ওপর পুলিশি সহিংসতা বন্ধের দাবি। তিনি বলেন, জবাবের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সবাই ক্লান্ত।
রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়েও মতভেদ আছে। ফরাসি কট্টর ডানপন্থীরা দাবি করছেন, দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জটিলতা ফ্রান্সের আন্দোলনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা বলেছেন, ইতালির পরিস্থিতি ফ্রান্সের চেয়ে অনেক আলাদা এবং তাঁদের দেশে এমন কোনো সমস্যা নেই।
এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে জ্বালানিসংকট। ইরানে চলমান যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমায় জ্বালানিপণ্যের দাম বেড়েছে হু হু করে। ইতালিতে ট্রাকচালকেরাও বিক্ষোভে নেমেছেন। জ্বালানি সরবরাহ কমায় তাঁদের কাজ ও আয় কমেছে, বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে গিয়ে প্রায় সব পণ্যের দামও বেড়েছে। চালকদের অবরোধে দেশটিতে মহিষের দুধের মোজারেলা পনির এবং কয়েক ধরনের পাস্তার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
আবাসনসংকটের মতো ইস্যু প্রজন্মের ব্যবধানও ঘুচিয়ে দিয়েছে। এতে তরুণদের পাশাপাশি বয়স্করাও আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। রোমের শিক্ষার্থী এলিসা পাস্তোরে ও তাঁর ভাই একই কক্ষে থেকে পড়াশোনা করছেন, কিন্তু সেই কক্ষের ভাড়া দিতেও তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এক শিক্ষার্থী জানান, খরচ বাঁচাতে তিনি একসময় রোম থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতেন। শিক্ষার্থীদের মতে, সাশ্রয়ী আবাসনের সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষার গভীর সম্পর্ক আছে।
সামনে আরও কর্মসূচি আসছে। ফ্রান্স ও স্পেনের প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলো যথাক্রমে ৫ ও ১১ নভেম্বর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। ‘জেন-জেড রেগেল্ট’ নামের একটি সংগঠন ৩১ অক্টোবর জার্মানিজুড়ে বিক্ষোভ করবে। শিক্ষার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ২০ নভেম্বর এক দিনের কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করছে ইতালি ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো।
সব মিলিয়ে ইউরোপের এই আন্দোলন কেবল আলাদা আলাদা দাবির সমষ্টি নয়। এটি একটি প্রজন্মের অনিশ্চয়তার প্রকাশ, যারা মনে করছে তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্ম যে সুযোগ পেয়েছে, তারা তা পাবে না। সরকারগুলোর হাতে সম্পদ সীমিত, আর তরুণদের ধৈর্যও ফুরিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। এই দ্বিমুখী চাপ সামাল দিতে না পারলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। আবার সার্বিয়া, আলবেনিয়া ও স্পেনের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, আন্দোলন কোথাও কোথাও সরাসরি রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকেও গড়াচ্ছে। তবে সব দেশের পরিস্থিতি এক নয়, আর কোন আন্দোলন কতদূর যাবে, তা এখনই বলা কঠিন। আপাতত নজর থাকছে সার্বিয়ার নির্বাচনের ফল এবং নভেম্বরের নির্ধারিত ধর্মঘট ও কর্মসূচির দিকে।

