নরওয়ের আর্কটিক অঞ্চলের ছোট দ্বীপ সোমারয়ে বছরের প্রায় ৬৯ দিন সূর্য অস্ত যায় না। মধ্যরাতেও সেখানে চারপাশ দিনের মতো আলোকিত থাকে। একসময় দ্বীপটিকে বিশ্বের প্রথম ‘সময়মুক্ত অঞ্চল’ বানানোর খবর ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বাস্তবে সেখানকার মানুষ ঘড়ির নিয়ম ছেড়ে দেননি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে দ্বীপটির জীবনযাপন ও ওই প্রচারণার নেপথ্য কাহিনি উঠে এসেছে।
সোমারয় নরওয়ের ট্রমসো শহর থেকে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। মাছ ধরার জন্য পরিচিত এই দ্বীপে বসবাস করেন প্রায় ৩০০ মানুষ। চারপাশে পাহাড়, সমুদ্রের খাঁড়ি, ছোট বন্দর আর রঙিন বাড়িঘর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে গ্রীষ্মকালে এখানে পর্যটকদের ভিড় বাড়ে।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, আর্কটিক বৃত্তের উত্তরে থাকা এই দ্বীপে প্রতিবছর ১৮ মে থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত সূর্য অস্ত যায় না। ফলে এ সময় দিন ও রাতের স্বাভাবিক পার্থক্য প্রায় মুছে যায়। শীতকালে চিত্র ঠিক উল্টো। তখন দীর্ঘ সময় সূর্যের দেখা মেলে না, দিনের বেলাতেও অন্ধকারে থাকতে হয় বাসিন্দাদের।
২০১৯ সালে সোমারয়কে ঘিরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তখন প্রচার করা হয়, দ্বীপের বাসিন্দারা ঘড়ির প্রচলিত নিয়ম থেকে বেরিয়ে আসতে চান। গ্রীষ্মের দীর্ঘ সময়ে সূর্য না ডোবায় তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা ছাড়া জীবন কাটানোর উদ্যোগ নিয়েছেন বলেও বলা হয়।
প্রচারণার অংশ হিসেবে দ্বীপের কাছের একটি সেতুর রেলিংয়ে বেশ কিছু হাতঘড়ি ঝুলিয়ে রাখা হয়। স্থানীয় এক হোটেলমালিক বাসিন্দাদের স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদনপত্র নরওয়ের পার্লামেন্টের এক সদস্যের কাছেও জমা দেন।
পরে জানা যায়, পুরো উদ্যোগের পেছনে ছিল নরওয়ের সরকারি পর্যটন উন্নয়ন সংস্থা ‘ইনোভেশন নরওয়ে’। পর্যটক টানতেই এই প্রচারণা চালানো হয়েছিল। দ্বীপের অল্প কয়েকজন বাসিন্দা এতে যুক্ত থাকলেও অনেকেই বিষয়টি জানতেন না। ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সংস্থাটির প্রধানকে ক্ষমা চাইতে হয়। সেতুতে ঝোলানো ঘড়িগুলোও সরিয়ে নেওয়া হয়।
প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্য থাকলেও সোমারয়ের জীবন পুরোপুরি সময়ের নিয়মের বাইরে নয়। হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও স্কুল এখনো নির্ধারিত সময় মেনেই চলে।
পোলিশ পর্যটক এভা কাচিনস্কি বিবিসিকে জানান, সময়মুক্ত অঞ্চলের প্রচারণা শুনেই সেখানে যেতে আগ্রহী হয়েছিলেন তিনি। ব্যস্ত জীবন থেকে কয়েক দিনের জন্য ঘড়ির হিসাব ভুলে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গিয়ে দেখেন, দোকান ও রেস্তোরাঁ নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। হোটেলের অভ্যর্থনাকক্ষও সারা রাত খোলা থাকে না। এতে প্রথমে কিছুটা হতাশ হন তিনি। পরে ফোন বন্ধ রেখে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটিয়ে স্বস্তি পান। তাঁর মনে হয়েছে, এখানে সময়ের চাপ অন্য জায়গার চেয়ে কম।
ডাচ পর্যটক ওয়াউটার দে উইট বলেন, মধ্যরাতে সমুদ্রে সাঁতার কাটতে নেমেছিলেন তিনি, তখনো আকাশে সূর্য উজ্জ্বল ছিল। ঘড়ি না থাকলে সময় বোঝাই কঠিন হতো।
বাসিন্দাদের অনেকে অবশ্য সময়মুক্ত অঞ্চলের ধারণা নিয়ে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তাঁদের মতে, দৈনন্দিন জীবন চালাতে সময়ের হিসাব দরকার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হোটেলকর্মী জানান, বিষয়টি মূলত মজার একটি ধারণা ছিল। গ্রীষ্মকালে দ্বীপের মানুষ এমনিতেই কিছুটা স্বাধীনভাবে চলেন। দোকানে ক্রেতা না থাকলে মালিক মাছ ধরতে চলে যেতে পারেন। পরদিন স্কুল বন্ধ থাকলে শিশুরা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। অনেকে ছুটিতে থাকায় জীবনের গতিও কিছুটা ধীর হয়ে আসে।
তবে এই স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রচারণা শুরু হলে অনেক বাসিন্দা অস্বস্তিতে পড়েন। পর্যটকেরা দ্বীপের প্রকৃতি বা সংস্কৃতির চেয়ে সময়মুক্ত অঞ্চলের বিষয়টি নিয়েই বেশি জানতে চাইতেন। ওই হোটেলকর্মীর ভাষ্য, কয়েক বছরে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। তবে প্রচারণার সুবাদে বিশ্বের নানা দেশের মানুষের কাছে সোমারয়ের নাম পৌঁছেছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রীষ্মে গভীর রাতেও দ্বীপ দিনের মতো আলোকিত থাকে, অথচ রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য। বাড়িঘর নীরব, যানবাহনও কম। ফলে আকাশের আলো দেখে সময় আন্দাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই ঘটনা দেখায়, পর্যটনের প্রচারে আকর্ষণীয় গল্প তৈরি করা সহজ, কিন্তু স্থানীয় মানুষের সম্মতি ও বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল না থাকলে তা প্রশ্নের মুখে পড়ে। একটি সরকারি সংস্থা বাসিন্দাদের না জানিয়ে তাঁদের নামে প্রচারণা চালানোয় আস্থার সংকটও তৈরি হয়েছে। আবার এতে দ্বীপটির পরিচিতি বেড়েছে, যা পর্যটন আয়ের দিক থেকে স্থানীয়দের জন্য সুফলও আনতে পারে। তবে সেই সুফল কতটা, তা প্রতিবেদনে বলা হয়নি।
শেষ পর্যন্ত সোমারয় বিশ্বের প্রথম সময়মুক্ত অঞ্চল হয়নি, বাসিন্দারাও ঘড়ির নিয়ম বাতিল করেননি। তবে টানা ৬৯ দিন সূর্য না ডোবায় দিন-রাতের প্রচলিত ধারণা সেখানে অনেকটাই বদলে যায়। প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ধীরগতির এই জীবন এখনো পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।

