দীর্ঘ প্রায় চার মাস আটক থাকার পর রোববার ইসরায়েলের ওফার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন ৭১ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি চিকিৎসক মাজেন আল-রান্তিসি। মুক্তির পর তাঁর শরীরে শারীরিক নির্যাতনের দৃশ্যমান চিহ্ন দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে তাঁকে অত্যন্ত শীর্ণ দেখাচ্ছিল। তাঁর কপালে ছিল বড় একটি লাল ক্ষত।
দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা ফি মওকুফ করা, বিনা মূল্যে ওষুধ দেওয়া এবং নিম্ন আয়ের ফিলিস্তিনিদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হওয়া একটি ক্লিনিক পরিচালনার কারণে আল-রান্তিসি ‘দরিদ্রের চিকিৎসক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। গত ২১ জুন অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় তাঁর বাড়িতে ভোররাতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়।
পরে সরকারি কৌঁসুলিরা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। ফিলিস্তিনের অলাভজনক সংস্থা ইউনিয়ন অব হেলথ ওয়ার্ক কমিটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। সংস্থাটি প্রতিবছর হাজারো ফিলিস্তিনিকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে।
ইসরায়েলের ওফার কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় শারীরিক নির্যাতন ও চিকিৎসাসেবায় অবহেলার শিকার হওয়ার কথা আইনজীবীদের জানিয়েছিলেন আল-রান্তিসি। সংবাদমাধ্যম হারেৎজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। তাঁর অভিযোগ, কারাগারে নেওয়ার পর প্রথম ১০ দিন তাঁকে নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হয়নি। এখনো তাঁর প্রয়োজনীয় একটি ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে না।
এদিকে, ৬৬৫ দিন আটক থাকার পর গত জানুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া চিকিৎসক আহমেদ মুহান্না মঙ্গলবার হেলথকেয়ার ওয়ার্কার্স ওয়াচকে (এইচডব্লিউডব্লিউ) বলেন, ফিলিস্তিনি চিকিৎসকদের বিশেষভাবে আটকের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। আটক অবস্থায় তাঁদের ওপর বিশেষভাবে নৃশংস আচরণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
গাজার আল-আওদা হাসপাতালের পরিচালক মুহান্না আটক থাকাকালে নিজের শরীরের ওজনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য, ইসরায়েলি কারারক্ষীদের উপস্থিতিতেই কয়েকজন ফিলিস্তিনি বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। সহিংস জিজ্ঞাসাবাদের সময় আহত বন্দীদেরও আটক স্বাস্থ্যকর্মীরা চিকিৎসা দিতে পারেননি বলে জানান তিনি।
এইচডব্লিউডব্লিউর চিকিৎসক রেবেকা ইংলিস মঙ্গলবার বলেন, প্রায় ১০০ স্বাস্থ্যকর্মীকে ইসরায়েলের আটক রাখার ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, ইসরায়েলি হেফাজতে ফিলিস্তিনি বন্দীদের নির্যাতনের ব্যাপক তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। এ কারণে আটক স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে তাঁরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
এখনো আটক ৯৪ ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্যকর্মী
এইচডব্লিউডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, গাজা থেকে ৮০ জন এবং অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে ১৪ জন ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্যকর্মী এখনো ইসরায়েলের হেফাজতে রয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশকেই দায়িত্ব পালনকালে হাসপাতাল বা অ্যাম্বুলেন্স থেকে ইসরায়েলি সেনারা আটক করে নিয়ে যান।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক চিকিৎসক হুসাম আবু সাফিয়া। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে উত্তর গাজার এই হাসপাতাল থেকে তাঁকে আটক করা হয়। হাসপাতালটি খালি করে দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের দেওয়া নির্দেশ অমান্য করেছিলেন তিনি। সে সময় গাজা উপত্যকার চালু থাকা শেষ কয়েকটি চিকিৎসাকেন্দ্রের একটি ছিল কামাল আদওয়ান হাসপাতাল। এরপর থেকে কোনো অভিযোগ গঠন ছাড়াই তাঁকে আটক রাখা হয়েছে।
জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, আবু সাফিয়া অব্যাহত ও গুরুতর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁর পরিবার ও আইনজীবীও জানিয়েছেন, তাঁর শরীরে গুরুতর নির্যাতনের চিহ্ন দেখা গেছে।
মানবাধিকার সংস্থা ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার সময় আবু সাফিয়া জানিয়েছিলেন, কারারক্ষীরা তাঁকে মারধর করেছেন এবং আটক অবস্থায় তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কথা না বলতে হুমকি দিয়েছেন।
সংস্থাটি ও আবু সাফিয়ার আইনজীবী জানান, কারারক্ষীরা হাত, পা ও লাঠি দিয়ে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেছেন। এর মধ্যে সংবেদনশীল অঙ্গও রয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন এবং ৩৬৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
এইচডব্লিউডব্লিউর তথ্য বলছে, আটক অবস্থায় ছয়জন স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে বা তাঁদের হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নিহত স্বাস্থ্যকর্মীদের মরদেহ এখনো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

