যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোয় বইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠন পেন আমেরিকার সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, গত এক বছরে দেশটির স্কুল থেকে প্রায় ১২ হাজার বই সরিয়ে নেওয়া বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংগঠনটি পাঁচ বছর আগে এ বিষয়ে হিসাব রাখা শুরু করে। তখন থেকে এ পর্যন্ত এবারের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
পেন আমেরিকার ‘ব্যানড ইন দ্য ইউএসএ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে মোট ১১ হাজার ৯৮২টি নিষেধাজ্ঞার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় আলাদা আলাদা বইয়ের সংখ্যা ৭ হাজার ৩৭০। অর্থাৎ অনেক বই একাধিক স্কুল বা জেলায় একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে চার হাজারের বেশি বই এবারই প্রথম নিষিদ্ধের তালিকায় ঢুকেছে। হিসাব করলে দেখা যায়, নিষিদ্ধ বইয়ের ষাট শতাংশের বেশিই নতুন। এতে বোঝা যায়, নিষেধাজ্ঞার পরিধি আগে থেকে চিহ্নিত কিছু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ক্রমেই নতুন নতুন বই এর আওতায় আসছে।
নতুন তালিকায় ঢোকা বইগুলোর মধ্যে আছে উনিশ শতকের ক্লাসিক উপন্যাস জেন আয়ার এবং সুই ইশিদার জনপ্রিয় মাঙ্গা সিরিজ টোকিও গুল। দুটি বইয়ের ধরন ও পাঠকগোষ্ঠী একেবারেই আলাদা। এতে ইঙ্গিত মেলে যে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে বইয়ের সাহিত্যমান বা প্রকাশের সময় দিয়ে নয়, নির্দিষ্ট বিষয় বা দৃশ্যের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে।
লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন স্টিফেন কিং। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো এই তালিকার শীর্ষে আছেন তিনি। তাঁর বই ৩১২ বার সরানো হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে দ্য শাইনিং ও দ্য গ্রিন মাইল। তবে একক বই হিসেবে সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞা পেয়েছে প্যাট্রিক ম্যাককরমিকের উপন্যাস সোল্ড। ভারতে যৌন দাসত্বে বিক্রি হয়ে যাওয়া এক কিশোরীর গল্প নিয়ে লেখা এই বইটি ২৫ বার সরানো হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে পেন আমেরিকা।
নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকায় আরও আছে মার্গারেট অ্যাটউডের দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল, লরি হ্যালস অ্যান্ডারসনের স্পিক এবং এলেন হপকিন্সের ক্র্যাঙ্ক। স্পিক উপন্যাসে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া এক কিশোরীর গল্প বলা হয়েছে। ক্র্যাঙ্কের বিষয় মাদকাসক্তি। লক্ষ করার বিষয়, এসব বইয়ের অনেকগুলোই কঠিন সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে লেখা। কিশোর-কিশোরীরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে, এসব বই সেগুলো নিয়েই কথা বলে। সমর্থকেরা এ কারণেই বইগুলোকে শিক্ষার্থীদের জন্য উপকারী মনে করেন। আবার বিরোধীরা এসব বিষয়কে স্কুলের পরিবেশে অনুপযুক্ত বলে যুক্তি দেন।
বই নিষিদ্ধ করার পেছনে কারণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে বর্ণ ও বর্ণবাদ, যৌনতা এবং লিঙ্গপরিচয়ের মতো বিষয়। এই বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিতর্কেও বহুদিন ধরে আলোচিত। ফলে স্কুলের গ্রন্থাগারের তাকের বিতর্ক অনেক সময় বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজনেরই প্রতিফলন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ভৌগোলিকভাবে ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে নিষেধাজ্ঞার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এই দুই রাজ্যে স্কুলের বইয়ের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে আইন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি রাজনীতিক ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোও নানা বই স্কুল থেকে সরানোর দাবি তুলছে। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞার পেছনে একদিকে আইনি কাঠামো, অন্যদিকে সংগঠিত চাপ, দুটিই কাজ করছে।
এবার একটি নতুন প্রবণতাও দেখা গেছে। কোন বই সরানো হবে, তা বাছাই করতে স্কুল কর্তৃপক্ষের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। প্রযুক্তির সাহায্যে হাজার হাজার বই দ্রুত যাচাই করা সম্ভব হলেও এতে একটি ঝুঁকি থাকে। বইয়ের পুরো প্রেক্ষাপট না বুঝে নির্দিষ্ট শব্দ বা বিষয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হলে ভালো সাহিত্যও তালিকায় পড়ে যেতে পারে। এতে নিষিদ্ধ বইয়ের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রতিবেদনে পেন আমেরিকা স্কুলের গ্রন্থাগারের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছে। সংগঠনটির মতে, গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নানা মত ও চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। বই নিষিদ্ধ হলে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন লেখা, মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বঞ্চিত হয়। এতে তাদের বই পড়ার স্বাধীনতাও বাধাগ্রস্ত হয়।
বই নিষিদ্ধের পরিসংখ্যান নিয়ে অবশ্য একটি বিষয় বোঝা জরুরি। পেন আমেরিকা ও আমেরিকান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশন, দুটি সংগঠনই জানিয়েছে, ২০২০-এর দশকের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বই নিষিদ্ধের ঘটনা অনেক বেড়েছে। কিন্তু দুই সংগঠনের হিসাব রাখার পদ্ধতি আলাদা। পেন আমেরিকা কোনো বই সাময়িকভাবে সরানো হলেও সেটিকে নিষেধাজ্ঞা হিসেবে গণনা করে। আর আমেরিকান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশন শুধু স্থায়ীভাবে সরানো বইয়ের হিসাব রাখে। এপ্রিলে প্রকাশিত সংগঠনটির প্রতিবেদনে আগের এক বছরে বই নিষিদ্ধের ঘটনা ছিল প্রায় ৫ হাজার ৬০০। এই পার্থক্যের কারণে দুটি সংখ্যা সরাসরি তুলনা করা যায় না। তবে দুই পদ্ধতিতেই বোঝা যায়, প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী।
সব মিলিয়ে এবারের প্রতিবেদন যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলের বই নিয়ে চলমান টানাপোড়েনের এক স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। আইন, রাজনৈতিক চাপ ও প্রযুক্তির ব্যবহার, তিনটি বিষয়ই এই প্রবণতাকে গতি দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা ও তাদের তথ্য জানার অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় টানা হবে। এই বিতর্কের সমাধান না হলে আগামী বছরগুলোতে নিষিদ্ধ বইয়ের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: এপি

