ইসরায়েলে আজ মঙ্গলবার সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হচ্ছে। স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোট শুরু হয়ে চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর দেশটিতে এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
গাজা যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা এবং দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, সব মিলিয়ে ভোটটিকে দেশের ভেতরে ও বাইরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। জনমত জরিপ বলছে, কোনো পক্ষই সহজে সরকার গড়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ফলে ফলাফলের পর নতুন করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
ভোটের দুই দিন আগে, গত ২৪ অক্টোবর, তেল আবিবে নেতানিয়াহুবিরোধী বড় সমাবেশ হয়। সেখানে ‘পরিবর্তন আসছে’ লেখা পোস্টার হাতে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। তাঁদের দাবি ছিল ভোটের মাধ্যমে সরকার বদল এবং ৭ অক্টোবরের হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত। এক বিক্ষোভকারী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ওই হামলার দায় বর্তমান সরকারের, অথচ তারাই আবার ভোটে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, হামলার পরদিনই তাদের সরে যাওয়া উচিত ছিল। সমাবেশের অনেকে সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কের কথাও জানান।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সমর্থকদের একাংশ আশা করছেন, তিনি আবারও সরকার গঠন করবেন। কেউ কেউ মনে করছেন, কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। আবার একদল পর্যবেক্ষক সতর্ক করছেন, ডানপন্থিরা জয়ী হলে পরিস্থিতি আগের মতোই থাকবে, এমনকি আরও জটিল হতে পারে।
এই নির্বাচনের গুরুত্বের একটি বড় কারণ গত তিন বছরে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থানের পরিবর্তন। ৭ অক্টোবরের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক আদালতে গাজায় গণহত্যার অভিযোগের মুখে আছেন। ইসরায়েল এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পিউ গবেষণা কেন্দ্রের জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ দেশটির প্রতি অনুকূল মনোভাব রাখেন না। ইউরোপের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি অধিকৃত অঞ্চলের ইসরায়েলি পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞাও এসেছে। এ বাস্তবতায় ভোটটি শুধু একজন নেতার ভাগ্য নয়, রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থানের দিকনির্দেশনাও ঠিক করে দিতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এবারের লড়াই কার্যত ‘নেতানিয়াহু বনাম নেতানিয়াহুবিরোধী’। বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষের কাছে নেতানিয়াহু পরিচিত মুখ। তাঁর প্রতিপক্ষ নেতাদের নাম অনেকের কাছেই অজানা। বিরোধী দলগুলোর সবচেয়ে বড় অভিন্ন লক্ষ্য তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো। অন্যদিকে নেতানিয়াহু ভোটারদের কাছে তাঁর ‘অসমাপ্ত কাজ’ শেষ করার সুযোগ চাইছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে সবচেয়ে প্রধান হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা।
সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, গত দুই বছরে ইরানে একাধিক সর্বাত্মক হামলা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে চালানো অভিযানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও শীর্ষ সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিরা নিহত হন। ইরানের আকাশ ও নৌ প্রতিরক্ষাও বড় ধাক্কা খেয়েছে। তবু নেতানিয়াহু বলছেন, কাজটি শেষ হয়নি। এ কারণেই তিনি আরও সময় চাইছেন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারণায় ভয় ও হুমকির সুর থাকলেও তিনি নিজেকে পুরোপুরি ‘বিজয়ী’ হিসেবে তুলে ধরতে পারছেন না।
নির্বাচনের মূল ইস্যু নিয়ে দুই শিবিরের অবস্থান আলাদা। বিরোধীদের মূল বার্তা, নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো। আর তাঁর সমর্থকদের বক্তব্য, ডানপন্থি নেতৃত্ব ফিরিয়ে এনে ইসরায়েলকে সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী করা। এএফপির বরাতে ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর জানিয়েছে, ৭ অক্টোবরের হামলার জবাবদিহি, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশল, সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকেও অনেকে মূল ইস্যু হিসেবে দেখছেন।
বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের প্রশ্নটি দেশের ভেতরে গভীর বিভাজন তৈরি করেছে। উগ্র ধর্মীয় ইহুদিদের একটি বড় অংশ সামরিক প্রশিক্ষণ নেয় না, তারা ধর্মীয় শিক্ষায় মনোযোগ দেয় এবং নানা ধরনের সরকারি সহায়তা পায়। বাকি ইহুদিদের একটি অংশ সামরিক দায়িত্ব পালন করে। তাদের দাবি, এই দায়িত্ব সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে টানাপোড়েন চরমে পৌঁছেছে।
যুদ্ধ নিয়ে অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজা ও লেবানন যুদ্ধ এই নির্বাচনে খুব বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে হচ্ছে না। ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের সময় ইসরায়েলিদের কয়েক সপ্তাহ আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হলেও অধিকাংশ ইহুদি নাগরিক যুদ্ধের প্রতি সমর্থন ধরে রেখেছেন। ক্ষমতাসীন ডানপন্থিদের মতো বিরোধী নেতারাও এসব যুদ্ধকে ভোটারদের সামনে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরছেন।
ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘাতের প্রশ্নে ক্ষমতাসীন দলগুলো যতটা প্রচার চালাচ্ছে, বিরোধীরা ততটা চালাচ্ছে না। নেতানিয়াহুর সমর্থক উগ্র ডানপন্থি দলগুলো পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি বাড়িয়ে সেখানে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। তারা গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে সেখানে ইহুদি বসতি গড়ার কথাও তুলছে। বিরোধীদের কেউ কেউ পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় সরকারের মদদের অভিযোগ তুলে সমালোচনা করলেও কোনো বড় বিরোধী দলই ফিলিস্তিনি প্রশ্নকে নির্বাচনী এজেন্ডার কেন্দ্রে রাখেনি। অর্থাৎ বিরোধীরা ক্ষমতায় এলেও এসব ক্ষেত্রে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিতে পারছে না।
এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৩৮টি রাজনৈতিক দল। ১২০ আসনের সংসদ নেসেটে সরকার গড়তে লাগে ৬১ আসন। বর্তমানে নেতানিয়াহুর দল লিকুদের আসন ৩২টি। ১৯৭৩ সালে কয়েকটি চরম ও মধ্য ডানপন্থি দল মিলে গঠিত এই দলের নেতা প্রায় ১৯ বছর ধরে ইসরায়েল শাসন করছেন। অন্যান্য উগ্র ডানপন্থি দলের সমর্থনে তাঁর সরকার চলছে।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইসেনকট। তাঁর মধ্য ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী দল ‘ইয়াশার’ গত বছরের সেপ্টেম্বরে গঠিত হয় এবং এবারই প্রথম নির্বাচনে লড়ছে। এবিসি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, দলটি ২০ থেকে ২৩ আসন পেয়ে এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হতে পারে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকতে পারে লিকুদ, ১৯ থেকে ২০ আসন নিয়ে। একই সংবাদমাধ্যমের হিসাবে নেতানিয়াহুর জোট পেতে পারে ৪৯ থেকে ৫১ আসন, আর বিরোধী জোট ৫২ থেকে ৫৫ আসন। আরব দলসহ ছোট দলগুলোর ভাগে যেতে পারে ১৪ থেকে ১৯ আসন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল থারটিনের গত ২৩ অক্টোবরের জরিপ উদ্ধৃত করে টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, বিরোধী দলগুলো মিলে ৫৪ আসন পেতে পারে। নেতানিয়াহুর প্রতি সহানুভূতিশীল দলগুলো পেতে পারে ৫০ আসন, আর আরব দলগুলো ১৬ আসন। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কানের জরিপে বিরোধীরা ৫২ আসন, নেতানিয়াহুপন্থিরা ৫০ আসন এবং আরব দলগুলো ১৪ আসন পাচ্ছে। তিনটি জরিপেই দেখা যায়, কোনো জোট একা ৬১ আসনের ম্যাজিক সংখ্যায় পৌঁছাতে পারছে না। তাই সরকার গঠনে আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে হতে পারে। আবার নির্বাচনের পর কোনো দলের সদস্যরা দল বদল করলে হিসাব পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। তবে ইসরায়েলের ইহুদি দলগুলো সাধারণত আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করতে অনিচ্ছুক। এ কারণে সরকার গঠনের সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এবার প্রবাসী ইসরায়েলিদের ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ নানা দেশ থেকে ৫৩ হাজারের বেশি প্রবাসী ভোট দিতে দেশে ফিরছেন। আগের নির্বাচনগুলোয় এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার। বার্লিনে বসবাসকারী এলদাদ এইতান বলেন, বিদেশে থাকলেও ইসরায়েলই তাঁদের ‘বাড়ি’ এবং দেশের সব খবর তাঁরা রাখেন। অনেক প্রবাসী ভোটার এ নির্বাচনকে নিজেদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোট বলে মনে করছেন। প্রবাসীদের দেশে আনতে বেসরকারি উদ্যোগে বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। সান ফ্রান্সিসকো থেকে ‘ফ্লাইট ফর চেঞ্জ’ নামের একটি বিমানে করে ইসরায়েলিরা বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন আমেরিকা-ইসরায়েল ডেমোক্রেসি কোয়ালিশনের সভাপতি জোনাথন বারসাডে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলেকে বলেন, এই প্রবাসী ভোটারদের মাধ্যমে অন্তত দুজন নেসেট সদস্য নির্বাচিত হতে পারেন, যা সরকার গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর ভাষ্য, নেতানিয়াহুর শিবির মনে করছে প্রবাসী ভোটাররা বিরোধী জোটকে ভোট দেবেন। সে কারণে তারা প্রবাসীদের ভোটদানে নানাভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। লিকুদ দলও প্রবাসী ভোটারদের একটি বড় অংশ তাদের বিরুদ্ধে ভোট দেবে বলে ধারণা করছে।
ইসরায়েলের নাগরিকদের প্রায় ২২ শতাংশ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁদের ভোট এবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়েছে, আরব ভোটারদের সবচেয়ে বড় প্রেরণা ‘ভয়’। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরব নাগরিকদের অনেকে মনে করছেন, উগ্র ডানপন্থি সরকার ক্ষমতায় ফিরলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আরব দল তা’লের নেতা আহমাদ তিবি বলেছেন, এই সরকারের পতনের জন্য তাঁরা সম্ভাব্য সবকিছু করবেন। তাঁর মতে, আরবরা বেশি হারে ভোট দিলে নেতানিয়াহুকে সরানোর লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। তিনি আরও বলেন, আরবদের বেছে নিতে হচ্ছে নেতানিয়াহু, স্মোটরিচ ও বেন-গভিরের মতো নেতাদের এবং তাঁদের বিরোধীদের মধ্যে। এক আরব ভোটার বলেন, এই সরকার ফিরলে তা বিপর্যয় ডেকে আনবে।
ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলি আরবদের অনেকে প্রতিবাদ হিসেবে ভোট দেন না। তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আমজাদ ইরাকির মতে, এবার চিত্র ভিন্ন হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, উগ্র ডানপন্থিরা আবার ক্ষমতায় এলে দখলদারি ও জাতিগত নির্মূলের নীতির প্রতি জনসমর্থন আরও চার বছরের জন্য পাকাপোক্ত হবে বলে আরবদের অনেকে আশঙ্কা করছেন। নির্বাচনের আগে আরব নেতা সামি আবু শেহাদেহের প্রার্থিতা নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। উগ্র ডানপন্থি নেতাদের দাবির প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে নির্বাচনকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকা লাখো মানুষের ভোটাধিকার নেই, অথচ এই ভোটই তাঁদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ পরিচালক এরিকা গুয়েভারা রসাস বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, দশকের পর দশক ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করার কারণ নেই। সংস্থাটির অভিযোগ, নির্বাচনী প্রচারে কিছু প্রার্থী ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন, পশ্চিম তীরে বসতি ও দখল আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এবং গাজায় আরও ধ্বংসযজ্ঞের হুমকি দিচ্ছেন।
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, কৃষকদের ওপর সামরিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় জলপাই সংগ্রহের মৌসুম ভয়ের মৌসুমে পরিণত হয়েছে। সংস্থাটি গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা চলমান বলে অভিযোগ করেছে এবং যুদ্ধবিরতির এক বছর পরও সেখানে বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে। লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের হামলার প্রসঙ্গও তাদের প্রতিবেদনে আছে।
অ্যামনেস্টি ইসরায়েলের মিত্র দেশগুলোকে নতুন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করার আহ্বান জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি আরও জানিয়েছে, আজকের নির্বাচনে দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোতেও ভোটকেন্দ্র থাকবে, অথচ সেখানকার লাখ লাখ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থেকেও ভোটাধিকার পান না। ইসরায়েল এসব অভিযোগ বরাবর প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
দুই পক্ষের কাছেই এই নির্বাচনের বাজি অনেক বড়। নেতানিয়াহুর বিরোধীরা মনে করেন, তিনি হেরে গেলে দুর্নীতির মামলায় আদালতের মুখোমুখি হতে হবে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদণ্ডও হতে পারে। তাই এই ভোট তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎও ঠিক করবে। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকদের বিশ্বাস, ইসরায়েলের ভবিষ্যতের জন্য ডানপন্থি সরকার জরুরি এবং এই ধারার নেতৃত্বে নেতানিয়াহুই একমাত্র যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য।
তাঁদের প্রত্যাশা, তিনি ক্ষমতায় থাকলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও প্রভাব আরও বাড়বে। সমর্থকদের একাংশ গাজা, পশ্চিম তীর এবং লেবানন-সিরিয়ার কিছু অঞ্চলে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের পক্ষেও কথা বলছেন। ইসরায়েলেও এমন মানুষের অভাব নেই, যাঁরা মনে করেন নেতানিয়াহুর মতো নেতা শতাব্দীতে একবার আসেন। তাঁদের মতে, তিনি গুছিয়ে কথা বলতে পারেন, বিশ্ব রাজনীতি ভালো বোঝেন, নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস করেন না এবং বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।
প্রজন্মগত দিকটিও আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত প্রায় দুই দশকে শিক্ষাব্যবস্থায় ফিলিস্তিনবিরোধী মনোভাব ছড়িয়েছে। এতে নতুন ভোটারদের ৭০ শতাংশের বেশি নিজেদের ফিলিস্তিনবিরোধী হিসেবে পরিচয় দেন এবং নেতানিয়াহুকে নেতা মনে করেন। ফলে তাঁর জয় অপ্রত্যাশিত হবে না। আবার তরুণদের অনেকে বলছেন, জন্মের পর থেকে তাঁরা নেতানিয়াহুকেই দেখছেন এবং এবার তাঁকে সরানো দরকার। কাজেই বিরোধীদের জয়ও বিস্ময়কর হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও এ নির্বাচনের একটি আলোচিত দিক। নেতানিয়াহুর প্রধান মিত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে উপপ্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এ বিষয়ে নীরব থেকেছেন। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ভ্যান্স ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে চান। তিনি জানেন, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ বর্তমানে ইসরায়েলের প্রতি অনুকূল নয়। তাই এই ইস্যুতে মন্তব্য করে তিনি ভোটের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্পের সমর্থনে নেতানিয়াহুর অনুসারীরা উজ্জীবিত হলেও বিরোধীদের ভাষ্য, এতে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রকৃত অবস্থান ভোটারদের সামনে আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়। এটি যুদ্ধোত্তর ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, ফিলিস্তিনি প্রশ্নে ভবিষ্যৎ নীতি এবং বিশ্বে দেশটির অবস্থান নির্ধারণের একটি পরীক্ষা। জরিপ অনুযায়ী ফল হতে পারে অত্যন্ত কাছাকাছি। ফলে জোট গঠনের দর-কষাকষি, ছোট দল ও আরব দলগুলোর ভূমিকা এবং প্রবাসী ভোটের প্রভাবই চূড়ান্ত সরকারের চেহারা ঠিক করে দিতে পারে। ভোটের পরদিন, ২৮ অক্টোবর, ফলাফলের প্রাথমিক চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

