সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কূটনীতিক লানা নুসায়বেহকে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে যুক্তরাজ্য। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।
তবে সুদানের গৃহযুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নুসায়বেহর প্রার্থিতা সামনে এসেছে। আমিরাতের বিরুদ্ধে সুদানের আধা সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) সমর্থন ও সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে ‘গণহত্যার সুস্পষ্ট লক্ষণ’ রয়েছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও নুসায়বেহর প্রার্থিতাকে ঘিরে বিতর্কের একটি কারণ।
যুক্তরাজ্য সরকারের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্য নুসায়বেহর প্রার্থিতাকে সমর্থন করার সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র মিডল ইস্ট আইকে বলেন, “যুক্তরাজ্যের প্রধান অগ্রাধিকার হলো এমন একজন প্রার্থী খুঁজে বের করা, যিনি আমাদের বৈশ্বিক সংকটগুলো মোকাবিলায় জাতিসংঘকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।”
তিনি আরও বলেন, “জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নিতে আমরা প্রার্থীদের যোগ্যতার ওপর নজর দিচ্ছি। কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী সম্পর্কে আমরা প্রকাশ্যে মন্তব্য করব না।”
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সঙ্গে আবুধাবির সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা হিসেবেও নুসায়বেহকে সমর্থনের বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কে দুই পক্ষের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই সম্ভাবনা আলোচনায় এসেছে।
ম্যানচেস্টার সিটির মালিক সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজপরিবারের সদস্য ও দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান।
গত মাসে প্রকাশিত এক তদন্তে অভিযোগ করা হয়, ক্লাবটি ৮ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড বা ১১ কোটি ডলারের বেশি অবৈধ অর্থায়নের তথ্য গোপন করে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ১১৪টি আর্থিক নিয়ম ভঙ্গ করেছে। ম্যানচেস্টার সিটি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রিমিয়ার লিগের এসব পদক্ষেপের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ বাতিল করার হুমকি দিয়েছেন।
একাধিক সূত্রের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের মধ্যে যুক্তরাজ্য যদি জাতিসংঘের মহাসচিব পদে নুসায়বেহকে সমর্থন করে, তাহলে আবুধাবির সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিতে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
কে এই লানা নুসায়বেহ
নির্বাচিত হলে ৪৮ বছর বয়সী লানা নুসায়বেহ হবেন জাতিসংঘের প্রথম নারী মহাসচিব এবং মিসরের বুত্রোস বুত্রোস-ঘালির পর দ্বিতীয় আরব মহাসচিব।
তাঁর প্রার্থিতা সামনে আসার আগে মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ছয় দফা অনানুষ্ঠানিক ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব ভোটে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স—কোনো একজন প্রার্থীর বিষয়ে সম্মিলিতভাবে একমত হতে পারেনি।
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। নতুন মহাসচিব নিয়োগের জন্য নিরাপত্তা পরিষদকে ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের উদ্দেশ্যে একজন প্রার্থীর নাম সুপারিশ করতে হবে। তবে তার আগে নিরাপত্তা পরিষদ ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া নুসায়বেহ কর্মজীবনের শুরুতে ইউনেসকোর পরামর্শক এবং গালফ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। পরে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতি পরিকল্পনা বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক হন।
২০১৩ সালে তিনি জাতিসংঘে আমিরাতের প্রথম নারী স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সহসভাপতি, ইউএন উইমেনের নির্বাহী বোর্ডের সভাপতি এবং দুইবার নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
নুসায়বেহর পারিবারিক শিকড় ফিলিস্তিনে। তাঁর পরিবার জেরুজালেমের বাসিন্দা ছিল। তাঁর দাদা আনোয়ার নুসায়বেহ ছিলেন একজন প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ। জর্ডান পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম নিয়ন্ত্রণ করার সময় তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে জর্ডানের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও কাজ করেন।
নুসায়বেহ যুক্তরাজ্যের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে ইসরায়েলবিষয়ক ইমেরিটাস অধ্যাপক কলিন শিন্ডলার তাঁর শিক্ষক ছিলেন।
শিন্ডলার ২০২০ সালে জুয়িশ ক্রনিকল-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে লিখেছিলেন, নুসায়বেহ ইসরায়েলবিষয়ক গবেষণায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তাঁর মতে, নুসায়বেহ জায়নবাদ ও ইসরায়েলের ইতিহাস নিয়ে ‘চমৎকার ও সূক্ষ্ম’ কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন। শিন্ডলার তাঁকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত ‘আব্রাহাম চুক্তি’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবেও বর্ণনা করেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিছু অংশ সংযুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করার সময় নুসায়বেহ বলেছিলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত সব সময় আব্রাহাম চুক্তিকে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেছে। তিনি ইসরায়েল সরকারকে ওই পরিকল্পনা স্থগিত করার আহ্বান জানান।
গত সপ্তাহে মহাসচিব পদে প্রার্থিতার ঘোষণা দিয়ে নুসায়বেহ বলেন, “আমি মহাসচিব পদে প্রার্থী হয়েছি, কারণ আমি বিশ্বাস করি, এখন জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার সময়। আরও আগে পদক্ষেপ নিতে হবে, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানুষকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে এবং কার্যকর ফলাফল না আসা পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে হবে।”
সুদান সংকট ও আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
জাতিসংঘের মহাসচিব পদে নুসায়বেহর প্রার্থিতা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন সুদানের গৃহযুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাজ্য ঘোষণা করেছে, সুদানের র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) এবং সুদানি সশস্ত্র বাহিনীর (এসএএফ) ১৫ জন জ্যেষ্ঠ কমান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। তাদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতাসহ বিভিন্ন নৃশংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সুদানের আল-ফাশারে আরএসএফের নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেন, আল-ফাশারের নৃশংসতার এক বছর পরও যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত তদন্তে দেখা গেছে, সুদানের মানুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মিলিব্যান্ড বলেন, “এগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। অপরাধীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়া দেশগুলোর এই সহায়তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।”
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরএসএফ দারফুরে অ-আরব জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধ করেছে।
বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে আরএসএফকে অস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে। তবে আমিরাত সরকার এবং লানা নুসায়বেহ এসব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছেন।
নুসায়বেহর প্রার্থিতার ক্ষেত্রে তাই দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে জাতিসংঘে তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের রেকর্ড রয়েছে। অন্যদিকে, তাঁর দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ঘিরে বিতর্ক এবং সুদানের সংঘাতে আমিরাতের কথিত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য তাঁকে সমর্থন করবে কি না, নিরাপত্তা পরিষদের অন্য স্থায়ী সদস্যরা কী অবস্থান নেবে এবং সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রার্থিতা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে—এসব বিষয়ই নির্ধারণ করবে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের গতিপথ।

