মিডল ইস্ট আই
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এমন অনেক ফিলিস্তিনি নাগরিক, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে এই নির্বাচন বর্জন করে আসছিলেন। তাঁদের কাছে এবারের ভোট কেবল রাজনৈতিক প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার বিষয় নয়, বরং নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
ইব্রাহিম সাঈদ ১৯৮০ সাল থেকে ইসরায়েলের নির্বাচন বর্জন করে আসছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে তাঁর কাছে এসেছে, নিজেদের বিজয়ের পর তাঁর স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এমনকি ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় বাস্তুচ্যুত হওয়া তাঁর শহর আল-বিরওয়ায় পরিবারের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জীবনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। ৭০ বছর বয়সী সাঈদের মনে হয়েছে, ইসরায়েলি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাঁর সম্প্রদায়ের জন্য কার্যকর কোনো সমাধান দিতে পারেনি।
এবার তাঁর অবস্থান বদলেছে।
গ্যালিলিতে নিজের গ্যারেজে বসে সাঈদ বলেন, “নিঃসন্দেহে, এবার আমাদের ভোট দিতেই হবে। আমরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।”
মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত। চার বছর আগে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফেরেন। তাঁর কট্টর ডানপন্থী মিত্র বেজালেল স্মোট্রিচ ও ইতামার বেন-গভিরও তখন ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব অর্জন করেন।
এরপর গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘ সামরিক অভিযান, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলা এবং ফিলিস্তিনিদের অর্থনৈতিক ও চলাচলসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা বেড়েছে। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা; ইসরায়েল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি নাগরিকদের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন অনেকে। তাঁদের অভিযোগ, সংগঠিত অপরাধ ও সহিংসতা মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। একই সঙ্গে বৈষম্য এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে গ্রেপ্তার, চাকরি থেকে বরখাস্ত কিংবা অনলাইনে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ইসরায়েলের কয়েকটি রাজনৈতিক দল ফিলিস্তিনিদের নির্বাসন ও বাস্তুচ্যুতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টির কথা উল্লেখ করা হয়। দলটি গ্যালিলি ও নেগেভ অঞ্চলে ‘ইহুদীকরণ’ জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই দুই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নাগরিক বসবাস করেন।
সাঈদের ভাষায়, “আমরা নিরাপদ বোধ করছি না। নিরাপত্তার অনুভূতি পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে—আমি সব ধরনের নিরাপত্তার কথাই বলছি। আমার নিজেকে শুধু দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে হয় না, বরং বিংশ শ্রেণির নাগরিক বলে মনে হয়।”
ভোটের পেছনে আস্থার সংকট
২০২২ সালের নির্বাচনে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রায় ৫৪ শতাংশ ভোট দিয়েছিলেন। এবার কিছু জরিপ ও বিশ্লেষকের ধারণা, ভোটদানের হার বেড়ে ৬৮ শতাংশ কিংবা তারও বেশি হতে পারে।
এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী জোট জয়েন্ট লিস্ট এবং রা’আম নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে প্রায় ১৫টি আসন পেতে পারে বলে কিছু পূর্বাভাসে ধারণা দেওয়া হয়েছে। এটি ২০২০ সালের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর অর্জিত সর্বোচ্চ আসনসংখ্যার সমান হতে পারে।
ইসরায়েলের ভ্যান লির ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক আমির ফখুরি বলেন, “আমার বিশ্বাস, ভোটদানের হার ৭২ বা ৭৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ইনশাআল্লাহ, হয়তো তার চেয়েও বেশি। নির্বাচনের দিন অনেক চমক থাকতে পারে।”
তবে ভোটদানের হার সম্পর্কে এসব হিসাব পূর্বাভাস, চূড়ান্ত ফল নয়।
ফখুরির মতে, ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা শুধু ২০১৮ সালের জাতি-রাষ্ট্র আইন বাতিল, বাড়তি বাজেট কিংবা আরও কিছু নাগরিক অধিকার আদায়ের জন্য ভোট দিতে যাচ্ছেন না। তাঁদের কাছে এই নির্বাচনের গুরুত্ব আরও মৌলিক।
তিনি বলেন, “আমরা উচ্ছেদ ঠেকাতে এবং আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদাগুলো রক্ষা করতে ভোট দিচ্ছি।”
ফখুরি মনে করেন, সাধারণত নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ক্ষেত্রে ভোট দেওয়ার পেছনে বিপরীত বাস্তবতাও কাজ করছে।
তাঁর ভাষায়, “এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার অভাব এবং এমন রাজনৈতিক শক্তি বা সরকারি ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরে থাকার চেষ্টা, যা হয়তো কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আজ টিকে থাকাই প্রধান প্রেরণা হয়ে উঠেছে।”

ফখুরির মতে, ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা যখন গাজা ও পশ্চিম তীরে ঘটে যাওয়া পরিস্থিতি নিজেদের জীবনে পুনরাবৃত্তি হওয়া ঠেকাতে ভোট দেওয়ার কথা বলেন, তখন তাঁদের অবস্থানের গভীরতা বোঝা যায়।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, তাঁরা নিজেদের রাষ্ট্রের কাছ থেকেই জাতিগত নির্মূল ও গণহত্যার মতো বিপর্যয় থেকে সুরক্ষা পাওয়ার আশায় ভোট দিচ্ছেন।
নির্বাচন বর্জন থেকে ভোট দেওয়ার দ্বিধা
ভোটের আগের সপ্তাহগুলোতে সংগীতশিল্পী জোয়ান সাফাদি দ্বিধায় ছিলেন। আরব বিশ্বে পরিচিত এই শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নির্বাচন বর্জন করে আসছেন।
তিনি বলেন, তাঁর বর্জনের সিদ্ধান্ত একটি সহজ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল—নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হওয়ার কথা, অথচ তাঁর মতে ইসরায়েলি রাষ্ট্রব্যবস্থা সেই শর্ত পূরণ করে না।
সাফাদি উল্লেখ করেন, জর্ডান নদী ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডে প্রায় সমানসংখ্যক ইহুদি ও ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। অথচ ইসরায়েলের প্রায় ২১ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিকই কেবল দেশটির সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন। তাঁরা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ।
তিনি বলেন, “পুরো ব্যবস্থাটি শুরু থেকেই অন্যায্য। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য আপনাকে খুব সীমিত সুযোগ দেওয়া হয়, কিন্তু আপনি কখনো এমন অবস্থানে পৌঁছাতে পারেন না, যেখান থেকে ইসরায়েলি নীতিকে অর্থপূর্ণভাবে প্রভাবিত করা যায়।”
সাফাদির মতে, নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি ইসরায়েলকে নিজেদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দেয়। নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পেছনে এটিই ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান কারণ।
তবে ইসরায়েলি সরকার ও সমাজে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির প্রভাব বাড়তে থাকায় তিনি নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছেন। তাঁর ধারণা, ক্ষমতাসীনদের পরিবর্তন হলে অন্তত কিছুটা কম কঠোর নেতৃত্ব আসতে পারে।
সাফাদি বলেন, “আমার একমাত্র আশা হলো, ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের পরিবর্তন করলে হয়তো এমন কেউ আসবেন, যিনি কিছুটা কম বর্বর ও বিকৃতমনা। আমরা মূলত ভয়াবহ কিছু থেকে সামান্য কম ভয়াবহ কিছুর দিকে যাওয়ার কথা বলছি।”
তবে তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর উদ্বেগও প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনার কথা লেখার পর তিনি রাতে ঘুমাতে পারেননি বলে জানান।
তিনি বলেন, “আমি এটা নিয়ে ভাবতে থাকলাম। আমি এটা কীভাবে করতে পারি? আমি কাকে ভোট দেব? এই মানুষগুলোর মধ্যে থেকে আমি কীভাবে একজনকে বেছে নেব?”
সাফাদির মতে, এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেয়ে বর্জন করা দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও তাঁর মনে রয়েছে।
কট্টর ডানপন্থীদের চাপেই কি ভোটের সিদ্ধান্ত?
সাফাদি মনে করেন, ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকেরা অনেক ফিলিস্তিনি নাগরিককে ভোট দিতে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি বলেন, “আরব দলগুলোর নিজেদের চেয়েও ইসরায়েলি ডানপন্থীরা আমাকে ভোট দিতে রাজি করাতে বেশি ভূমিকা রেখেছে। বেন-গভির এবং স্মোট্রিচ কার্যত আরব নির্বাচনী তালিকাগুলোর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন।”
সাফাদির মতো যাঁরা দীর্ঘদিন নির্বাচন বর্জন করেছেন, তাঁদের মধ্যে এবার ভোট দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।
জয়েন্ট লিস্টের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগের নির্বাচনের তুলনায় দলগুলো এবার প্রচারে কম অর্থ ব্যয় করছে। কারণ, স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টি, বেন-গভিরের জুইশ পাওয়ার এবং সাবেক এক কট্টরপন্থী জেনারেলের প্রতিষ্ঠিত আমচা ইসরায়েল দলের বক্তব্য ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলে দলটির ধারণা।
ফখুরির ভাষায়, “আমাদের এমন সরকারি মন্ত্রী আছেন, যাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হলো আমাদের অপমান করা, আমাদের নাগরিকত্বের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা এবং আমাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানা।”
তবে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতি বৈরিতা কেবল কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।
উত্তর ইসরায়েলের একজন মেকানিক আধাম, যিনি শুধু প্রথম নাম প্রকাশ করতে চেয়েছেন, সম্প্রতি বিরোধী দলগুলোর অন্যতম প্রধান দল টুগেদারের নেতা নাফতালি বেনেটের একটি নির্বাচনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
সেখানে শ্রোতারা বারবার জানতে চান, বেনেট আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠন করবেন কি না। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাবেক এক মোসাদ কর্মকর্তা তাঁদের আশ্বস্ত করেন যে বেনেট আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো জোট গঠন করবেন না।
আধাম বলেন, “বিষয়টা সুখকর ছিল না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এটা প্রচারণারই একটি অংশ। নির্বাচনের ফলাফল হাতে এলে তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে।”
আধামের অভিযোগ, ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলা এবং গাজায় পরবর্তী যুদ্ধের পর তাঁর স্ত্রী যে স্কুলে শিক্ষকতা করেন, সেখানে তাঁকে একঘরে করে রাখা হয়েছে।
তবে তিন সন্তানের বাবা হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ পরিবারের নিরাপত্তা। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সহিংস অপরাধের বিরুদ্ধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “সংগঠিত অপরাধ এবং আরব সম্প্রদায়গুলোতে একের পর এক মানুষ হত্যার ঘটনা আমাকে রাতে জাগিয়ে রাখে। আমার দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে আছে। তারা বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত আমি ঘুমাতে যাই না। রাত ১০টার পর আমি তাদের বাইরে থাকতে দিই না।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আমার সন্তানদের নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তিত থাকি, অথচ এই সরকার আমাদের অপরাধ থেকে রক্ষা করার জন্য কিছুই করেনি।”
এই উদ্বেগ থেকেই আধাম মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা’আম পার্টিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সামাজিকভাবে রক্ষণশীল এই দলটি ইসরায়েলের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের জন্য সুনির্দিষ্ট সুবিধা আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে।
এবার রা’আমের তালিকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইহুদি জায়নবাদী রাজনীতিক ইয়োভ সেগালোভিচ। তিনি ইসরায়েলের সাবেক পুলিশ মেজর-জেনারেল এবং আরব সম্প্রদায়গুলোতে অপরাধ দমনে কাজ করার জন্য পরিচিত।
নিরাপত্তাহীনতা থেকে অস্তিত্বের প্রশ্ন
ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগের পেছনে হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যানও রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ২৫২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে আরও ১৪৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। দ্য টাইমস অব ইসরায়েল-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে এসব হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১২ শতাংশের সমাধান করতে পেরেছে পুলিশ।
তবে নিরাপত্তাহীনতা শুধু অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অস্বস্তি এবং বিভিন্ন এলাকায় চলাচলের সময় ভয় পাওয়ার অভিজ্ঞতাও অনেকের জীবনে প্রভাব ফেলছে।
উত্তরাঞ্চলীয় ফিলিস্তিনি-সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর উম্ম আল-ফাহমের বাসিন্দা শিক্ষিকা মাহা মোহাম্মদ বলেন, “এমনকি যখন আমি কোনো ইহুদি শহর বা আরব-ইহুদি মিশ্র শহরে যেতে চাই, তখনও আমার ভয় লাগে।”
তিনি বলেন, তাঁর জন্মস্থান জাফাতেও তিনি এখন আগের মতো নিরাপদ বোধ করেন না। শহরটির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়ের গভীর যোগ রয়েছে। তবু সেখানে যাতায়াতের সময়ও তাঁকে সতর্ক থাকতে হয়।
মোহাম্মদের ভাষায়, “বাসে উঠতে বা এমন কোনো এলাকা দিয়ে হেঁটে যেতে আপনার দুশ্চিন্তা হয়, যেখানে আরব ও ইহুদিরা একসঙ্গে থাকে।”
হিজাব পরা একজন নারী হিসেবে তিনি মনে করেন, তাঁর পোশাক ধর্মীয় পরিচয় স্পষ্ট করে দেয়। ফলে কোথাও গেলে অন্যরা তাঁকে কীভাবে দেখছে, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, “আপনি উদ্বিগ্ন বোধ করেন এবং পুরোপুরি নিজের মতো থাকতে পারেন না। আপনার মনে হয়, আশপাশের মানুষ হয়তো আপনাকে ভয় পায় অথবা আপনার উপস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করে।”
মোহাম্মদের মতে, উম্ম আল-ফাহমের নারীদের সঙ্গে কথা বললে দেখা যায়, রাস্তায় অপরাধ ও নিরাপত্তার অভাব তাঁদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি।
তিনি বলেন, “তারা নিজেদের, সন্তানদের, পরিবার, প্রতিবেশী এবং পুরো সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা চায়। এটাই তাদের সবচেয়ে মৌলিক চাওয়া।”
ফিলিস্তিনি নাগরিকদের একটি অংশের কাছে তাই এবারের নির্বাচন শুধু দল বা নেতা বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া নয়। তাঁদের প্রত্যাশা, ভোটের মাধ্যমে এমন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে, যা অন্তত দৈনন্দিন নিরাপত্তা, নাগরিক মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে।
মাহা মোহাম্মদের কথায়, “আমরা যে আছি, আমরা যে এখানে আছি এবং এই দেশে আমাদের উপস্থিতি যে গুরুত্বপূর্ণ, তা নিশ্চিত করতেই আমরা ভোট দিচ্ছি।”

