জার্মানির এলিট বিশেষ বাহিনী রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য বড় আকারের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইউনিটটির কমান্ডার। জার্মান সংবাদমাধ্যম বিল্ডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। ইউক্রেন সংকটকে ঘিরে মস্কো ও ন্যাটোর মধ্যে উত্তেজনার মধ্যেই এই বক্তব্য এল। জার্মান কর্মকর্তারা আগেই সতর্ক করে বলেছেন, এই দশকের শেষ নাগাদ সশস্ত্র বাহিনীকে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
বাহিনীটির নাম কমান্ডো স্পেৎসিয়ালক্রেফ্টে, সংক্ষেপে কেএসকে। ব্রিটেনের এসএএস বা যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বেরেটের সঙ্গে এর তুলনা করা হয়। অত্যন্ত গোপনীয় এই ইউনিটের দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানির ঘাঁটি থেকে সোমবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিল্ড। তাতে বলা হয়েছে, কমান্ডোরা প্রশিক্ষণের ধরন বদলে নিচ্ছেন। লক্ষ্য, ট্যাংক, কামান, ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধসক্ষমতায় সজ্জিত রুশ বাহিনীর মোকাবিলা করা। চরম ঠান্ডার পরিবেশে লড়াইয়ের প্রস্তুতিও এর অংশ।
কেএসকের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আন্দ্রেয়াস কুনে বলেন, তাঁরা সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিপক্ষ হিসেবে রাশিয়াকে সামনে রেখেই নিজেদের গড়ে তুলছেন। যুদ্ধ শুরু হলে সেনাদের অনেক বেশি সময় মাঠে থাকতে হতে পারে, এমনকি এমন পরিস্থিতিতে, যার শেষ দেখা যাচ্ছে না, সেই প্রস্তুতিও রাখতে হবে বলে জানান তিনি।
কুনে আরও জানান, প্রচলিত জার্মান বাহিনী যুদ্ধে নামার আগেই বিশেষ অভিযান শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। লিথুয়ানিয়ায় মোতায়েন ৪৫তম সাঁজোয়া ব্রিগেড সত্যিকারের জরুরি পরিস্থিতিতে যখন যাত্রা শুরু করবে, তার আগেই কেএসকের কাজ সম্পন্ন হয়ে যেতে হবে, এমনটাই তাঁদের লক্ষ্য। বিল্ডের তথ্য অনুযায়ী, কেএসকের ১ হাজার ৫০০ সদস্যের মধ্যে কমান্ডো মাত্র এক-তৃতীয়াংশের মতো। বাকিরা প্রশাসনিক ও সহায়ক কাজে যুক্ত।
বাহিনীটির অতীত বিতর্কমুক্ত নয়। ২০১৭ সালে সেনাদের নাৎসি কায়দায় অভিবাদন এবং উগ্র ডানপন্থী গান শোনার খবরে তদন্ত শুরু হয়। ২০১৮ সালে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যের জড়িত থাকার একটি গোপন উগ্র ডানপন্থী নেটওয়ার্কের খোঁজ মেলে। অভিযোগ ছিল, জনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের হত্যার পরিকল্পনা নিয়েও তাঁদের কেউ কেউ আলোচনা করেছিলেন। ২০২০ সালে এক সার্জেন্ট মেজরের সম্পত্তিতে পুলিশ বিপুল অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক ও নাৎসি স্মারক উদ্ধার করে। কিছু গোলাবারুদ জার্মান সামরিক মজুত থেকে চুরি হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়।
এসব ঘটনার পর তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আনেগ্রেট ক্রাম্প-কারেনবাউয়ার কেএসকের চারটি কমান্ডো কোম্পানির একটি, দ্বিতীয় কোম্পানি, ভেঙে দেন এবং ব্যাপক সংস্কার চালু করেন। তবে বিশেষ বাহিনীর কমান্ড নিজে কার্যকর থাকে। কুনে বিল্ডকে বলেন, ইউনিটে শৃঙ্খলা ও আচরণগত ঘটনা এখন ‘অত্যন্ত বিরল’, তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অনিয়ম আর সহ্য করা বা চেপে যাওয়া হবে না।
চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস রাশিয়ার হুমকি হিসেবে যা দেখছেন, তার জবাবে জার্মান সশস্ত্র বাহিনীকে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত সামরিক বাহিনীতে রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। জার্মান অর্থনীতি ‘কাঠামোগত সংকটে’ আছে বলে স্বীকার করেও তাঁর সরকার প্রতিরক্ষা ব্যয় ও ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। জুলাইয়ে দ্য টেলিগ্রাফ ও ডি ভেল্ট জানিয়েছিল, রাশিয়ার সীমান্ত অভিমুখে ন্যাটো সেনা মোতায়েনে আঞ্চলিক সরকারগুলোর সম্ভাব্য বাধা এড়াতে বার্লিন একটি গোপন পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে মেৎসের এই সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সময়েই তাঁর সরকারের প্রতি জনসমর্থন কমছে। বিল্ডে প্রকাশিত ইনসা জরিপে এ সপ্তাহে ২০ জন শীর্ষ জার্মান রাজনীতিকের মধ্যে চ্যান্সেলর সবার শেষে। সেপ্টেম্বরে স্যাক্সনি-আনহাল্ট ও মেকলেনবুর্গ-ভর্পোমার্নের রাজ্য নির্বাচনে জয় পেয়েছে উত্থানশীল বিরোধী দল অল্টারনেটিভ ফর ডয়চল্যান্ড (এএফডি)। বার্লিনের নির্বাচনে বামপন্থী দল ডি লিনকে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এসেছে।
রাশিয়া বরাবরই ন্যাটো দেশগুলোতে হামলার পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করে আসছে। আগস্টে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মস্কো ন্যাটো সদস্যদের ওপর হামলা চালাতে চায় এমন খবরকে ‘ভীতি ছড়ানোর গল্প’ বলে উড়িয়ে দেন। তাঁর ভাষ্য, এসবের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই।
সব মিলিয়ে কেএসকের কমান্ডারের বক্তব্য ইউরোপে নিরাপত্তা উদ্বেগের নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে জার্মানি নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে, অন্যদিকে মস্কো সংঘাতের পরিকল্পনা অস্বীকার করছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস কতটা গভীর হয় এবং তা কূটনৈতিক পথে প্রশমিত হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

