ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও ভোট গণনার অগ্রগতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ফলে এখনই তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কোনো নিশ্চিত পথ তৈরি হয়নি। নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত তিনিই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বুধবার রাত পর্যন্ত প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনার পর ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের হিসাবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী, কট্টর ডানপন্থী ও আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোর জোট ১২০ আসনের নেসেটে ৫৩টি আসনের পথে রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮টি আসন এবং আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দল সম্মিলিতভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন পেতে পারে।
তবে ভোট গণনা এখনো শেষ হয়নি। কয়েক লাখ ‘ডাবল এনভেলপ’ ব্যালট—যার মধ্যে সেনাসদস্য, বিদেশে অবস্থানরত কূটনীতিকসহ বিশেষ ব্যবস্থায় দেওয়া ভোট রয়েছে—গণনা বাকি। ফলে আসনসংখ্যায় কিছু পরিবর্তন হতে পারে। চূড়ান্ত সরকারি ফল প্রকাশের আগে বর্তমান হিসাবকে প্রাথমিক ফল হিসেবেই দেখতে হবে।
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে নেতানিয়াহুবিরোধী শিবির তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকবে বলে আভাস পাওয়া গিয়েছিল। ভোটের পর প্রকাশিত এক্সিট পোলেও আইজেনকোটের জোট দুই থেকে তিন আসনে এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু প্রকৃত ভোট গণনা এগোতে থাকলে সেই চিত্র বদলে যায় এবং নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে যায়।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, শুরু হবে জোটের হিসাব
বর্তমান ফল অনুযায়ী কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ৬১ আসন পাচ্ছে না। ফলে নতুন সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জটিল আলোচনা ও সমঝোতা প্রয়োজন হবে।
নেতানিয়াহুর জোটে রয়েছে লিকুদ, শাস, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম, ওৎজমা ইয়েহুদিত এবং রিলিজিয়াস জায়োনিজম। সম্মিলিতভাবে তাদের সম্ভাব্য আসন ৫৩, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে আটটি কম। অন্যদিকে আইজেনকোটের ইয়াশার, নাফতালি বেনেটের বি’ইয়াচাদ, ডেমোক্র্যাটস এবং ইসরায়েল বেইতেনু মিলে বিরোধী জোটের সম্ভাব্য আসন ৪৮।
এই পরিস্থিতিতে আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমের সম্মিলিত ১৯টি আসন সরকার গঠনের সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর অধিকাংশই নির্বাচনের আগে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটে না যাওয়ার কথা জানিয়েছে। ফলে সংখ্যার হিসাবে সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবে জোট গঠন কঠিন হতে পারে।
নতুন সরকার গঠনের আলোচনা চলাকালে নেতানিয়াহুই দায়িত্বে থাকবেন। ইসরায়েলের ব্যবস্থায় নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত বিদায়ী সরকার কার্যকর থাকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলে এই পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ হতে পারে।
তত্ত্বাবধায়ক অবস্থায় থাকা সরকারের আইনগত ক্ষমতা ব্যাপক হলেও প্রচলিত রাজনৈতিক রীতি অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি বা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংযম প্রত্যাশা করা হয়। তবে জাতীয় নিরাপত্তা ও চলমান যুদ্ধের মতো জরুরি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে।
আইজেনকোটও বলেছেন, সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু দায়িত্ব পালন করবেন। তবে তাঁর অভিযোগ, এই সময় প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক স্বার্থে নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন।
আইজেনকোট নিরাপত্তা ও সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছেন, নেতানিয়াহু এমন একজন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী, যাঁর নতুন নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। কোনো রাজনৈতিক চাপের মুখে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের পেশাদার অবস্থান ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ডানপন্থার শক্তি, আরব ভোটের রেকর্ড উত্থান
নির্বাচনের প্রাথমিক ফল ইসরায়েলের রাজনৈতিক কাঠামোয় দুটি বিপরীত প্রবণতা তুলে ধরছে। একদিকে ইহুদি ভোটারদের মধ্যে ডানপন্থী ও জাতীয়তাবাদী দলগুলোর শক্ত অবস্থান বজায় রয়েছে। অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোও অভূতপূর্বভাবে আসন বাড়িয়েছে।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী নেতানিয়াহুর লিকুদ এককভাবে ২৬টি আসন পেতে পারে এবং নেসেটের বৃহত্তম দল হিসেবে থাকতে পারে। আইজেনকোটের ইয়াশার পেতে পারে ২১টি আসন। আর জয়েন্ট লিস্ট ১২টি ও রা’আম সাতটি আসন পেতে পারে।
ইসরায়েলের এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭৭.৭ শতাংশ, যা দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি। আরব নাগরিকদের ভোটদানের হারও ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যার ফলে আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা আগের সর্বোচ্চ ১৫ ছাড়িয়ে ১৯-এ পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রাথমিক ফল প্রকাশের পর জয়েন্ট লিস্টের সদর দপ্তরে সমর্থকেরা উল্লাস করেন। দলটির প্রার্থী ফাতেন গাত্তাস বলেন, “আমরা দখলদারত্ব ও বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করি। আমরা এখানেই থাকব।”
এর আগে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে গঠিত সরকার একপর্যায়ে একটি ছোট আরব দলের সমর্থনের ওপর নির্ভর করেছিল। এবার আইজেনকোটের জোট প্রত্যাশিত সংখ্যক আসন না পাওয়ায় আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া নেতানিয়াহুবিরোধী সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে অধিকাংশ ইহুদি রাজনৈতিক দল আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট করতে অনীহা দেখিয়েছে। সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক বাস্তবতাই এবার সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলছে।
যুদ্ধ, আইনি সংকট ও নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এরপর গাজায় যুদ্ধ শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে লেবানন ও ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং উপত্যকার বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে।
যুদ্ধ পরিচালনা এবং ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় নিয়ে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে। তিনি আইসিসির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সেগুলোকে ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছেন। দেশে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার বিচারও চলছে।
নেতানিয়াহুর দাবি, ইসরায়েলের ক্ষমতাধর অভিজাত শ্রেণির একটি অংশ তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরাতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছে।
তবে নির্বাচনের বর্তমান ফল দেখাচ্ছে, তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ফলে ভোটের ফল নেতানিয়াহুকে সরাসরি বিজয় এনে না দিলেও তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না।
অন্যদিকে আরব দলগুলোর নজিরবিহীন উত্থান নতুন সরকার গঠনের আলোচনায় একটি নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে। কোনো পক্ষ যদি ৬১ আসনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়তে না পারে, তাহলে দীর্ঘ জোট আলোচনা, নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা শেষ পর্যন্ত আরেকটি নির্বাচনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সূত্র: রয়টার্স

