জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের গতকাল প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যা সংঘটনের যে সিদ্ধান্ত তুলে ধরা হয়েছিল, নতুন প্রতিবেদনেও তার উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “এই প্রতিবেদনের জন্য তদন্ত করা ঘটনাগুলো থেকে দেখা যায়, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও বাহিনী গাজার ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে।”
অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৮ সাল থেকে ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত এসব হামলায় ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৪ জনে।
ইসরায়েল যদি ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েই যায়, তাহলে এই যুদ্ধবিরতি আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে?
যুদ্ধবিরতির পর থেকে আন্তর্জাতিক আলোচনা মূলত মানবিক সহায়তা, গাজা পুনর্গঠন, ‘ইয়েলো লাইন’ এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। অথচ ইসরায়েল বারবার জানিয়েছে, তারা দখল করা গাজার ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না। এমন পরিস্থিতিতে গাজা পুনর্গঠনের আলোচনা কার্যত একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে।
এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের গণহত্যা-সংক্রান্ত বক্তব্যেরই প্রতিফলন দেখা যায়। বাস্তবে পরিবর্তন এসেছে শুধু ব্যবহৃত শব্দ ও পরিভাষায়। যুদ্ধবিরতির পর বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে গণহত্যার প্রসঙ্গ খুব কমই উঠে আসছে। এর পরিবর্তে আবারও পৃথক পৃথক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে আলোচনার কেন্দ্রে আনা হচ্ছে। এর ফলে ইসরায়েলের গণহত্যার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট সংকুচিত হচ্ছে এবং পুরো আলোচনা থেকে ঔপনিবেশিকতার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে।
কয়েক দশক ধরে এ ধরনের বক্তব্য ও কূটনৈতিক ভাষা ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করে এসেছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া নিজের শেষ ভাষণে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের গণহত্যা-সংক্রান্ত বক্তব্যের উল্লেখ করেন। তবে জাতিসংঘে নিজের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর দায়িত্ব পালনের সময় ‘জাতিগত নির্মূলের আশঙ্কা’ সামনে এসেছে।
গুতেরেস বলেন, “আমাদের চোখের সামনে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে হারিয়ে যেতে দিতে পারি না।”
কিন্তু কার্যত অচল হয়ে পড়া দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ধারণাকে রক্ষার কথা বলার চেয়ে ইসরায়েলের দায়মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য আর ভালো উপায় কী হতে পারে?
যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক সুরক্ষার আড়ালে বিশ্বনেতারা এখন আগের পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার ভান করতে পারেন। একই সঙ্গে নিজেদের ভূমিকা আড়াল করতে তাঁরা সেই পুরোনো ও ইতিমধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো কাঠামোকেই ব্যবহার করতে পারেন।
এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর কোনো বিরোধিতা নেই।
অবশ্য গাজা রয়েছে। গণহত্যার সমস্ত পরিণতি বহন করতে হচ্ছে গাজাকেই। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দেওয়া দায়মুক্তি এবং সেই দায়মুক্তির মাধ্যমে নিজেদেরও জবাবদিহি থেকে রক্ষা করার সুযোগ।
ব্যর্থ যুদ্ধবিরতির মূল্যও গাজাকেই দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই যুদ্ধবিরতিকে একটি আড়াল হিসেবে ব্যবহার করছে, যাতে গণহত্যার প্রমাণের মুখোমুখি হতে না হয়।
অথচ গণহত্যার প্রমাণ ইতিমধ্যে বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ হয়েছে। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশের সরকার ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের একাধিক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে তুলে ধরতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।
যুদ্ধবিরতির সময় ইসরায়েল গণহত্যা বন্ধ করেনি; বরং এর মাত্রা এমন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এর ফলে লাভবান হচ্ছে কেবল তারাই, যারা এই গণহত্যায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।
যুদ্ধবিরতি মেনে চলার জন্য ইসরায়েলের প্রতি মাঝেমধ্যে আহ্বান জানানো ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেশটিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আগের কূটনৈতিক ভাষায় ফিরে যেতে পেরে স্বস্তি বোধ করছে। সেই ভাষায় কূটনীতিকদের প্রকাশ্য গণহত্যার বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতো না। আর জাতিগত নির্মূলের ঘটনাগুলোকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যেত।
এই যুদ্ধবিরতি মূলত সেটিই অর্জন করেছে।
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধবিরতি গাজার ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করার আগেই সম্ভবত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পুরোনো কূটনৈতিক বয়ানকে নতুন জীবন দেবে।
- রামোনা ওয়াদি: একজন স্বাধীন গবেষক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, বই সমালোচক এবং ব্লগার। ছবি: মিডল ইস্ট মনিটর

