ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সরাসরি জোট সরকারে যোগ না দিয়েও বিরোধী নেতৃত্বাধীন বিকল্প সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দেশটির অন্যতম শীর্ষ আরব নেতা ইউসুফ জাবারিন।
ইসরায়েলের আরব-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর প্রধান জাবারিন বলেছেন, গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের নীতি অব্যাহত থাকার কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ইসরায়েলি কোয়ালিশন সরকারের অংশ হওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে নেতানিয়াহুর সরকারকে সরাতে একটি বিকল্প সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার পথ খোলা রয়েছে।
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে গাজায় যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের বিষয় বিবেচনা করলে কোনো ইসরায়েলি কোয়ালিশন সরকারের অংশ হওয়ার সুযোগ আমরা দেখছি না।”
তবে তিনি একই সঙ্গে যোগ করেন, “বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর উদ্দেশ্যে আমরা জোটের বাইরে থেকে একটি বিকল্প সরকারকে সমর্থন করতে পারি।”
এর অর্থ, নেতানিয়াহু এবং তাঁর কট্টর ডানপন্থী মিত্র ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচকে ক্ষমতা থেকে সরাতে প্রধান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন কোনো সংখ্যালঘু বা বিকল্প সরকারকে সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করছেন না জাবারিন।
সরকার গঠনে নির্ণায়ক হতে পারে আরব দলগুলো
ইসরায়েলের নির্বাচনে ৮৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে কোনো পক্ষই ১২০ আসনের নেসেটে প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রাথমিক হিসাবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ব্লক ৫৩ আসনের দিকে এগোচ্ছে, বিরোধী শিবির ৪৮টি এবং আরব-নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলোর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিক। নেতানিয়াহু সরকারের উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতি, গাজায় সামরিক অভিযান এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের কারণে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে।
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট—দুজনই পরবর্তী সরকার গঠনের চেষ্টা চালানোর কথা জানিয়েছেন।
জাবারিন অবশ্য স্পষ্ট করে বলেছেন, নেতানিয়াহুর শাসনের কার্যকর বিকল্প তৈরি করতে হলে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোকে আরব রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আলোচনায় বসতেই হবে।
তিনি বলেন, “যে কেউ নেতানিয়াহুর রক্তপাতের সরকারের বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প দিতে চাইলে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।” জয়েন্ট লিস্টের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর সরকারকে সরাতে তারা রাজনৈতিক সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত।
জাবারিনের ভাষায়, এখন ইসরায়েলের সামনে একটি মৌলিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রয়েছে—“হয় বর্ণবাদ, বর্জন ও শ্রেষ্ঠত্ববাদের ধারা চলতে থাকবে, নয়তো ইহুদি ও আরবদের মধ্যে একটি বাস্তব অংশীদারত্ব গড়ে উঠবে।”
আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ লিকুদের
এদিকে ভোট গণনা চলার মধ্যেই নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচন ‘চুরি’ করার অভিযোগ তুলেছে।
লিকুদ দাবি করেছে, আরব দলগুলো ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা, জালিয়াতি এবং নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ভোটার উপস্থিতি প্রভাবিত করেছে। দলটি পুলিশ, শিন বেত এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে শত শত সাক্ষ্য ও প্রমাণ জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে নগদ অর্থভর্তি খাম, রা’আমের ব্যালট, ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের হুমকি এবং একাধিক অনিয়মের দাবি রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, অভিযোগগুলো তারা পর্যালোচনা করছে। আর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আরব এলাকাজুড়ে ব্যাপক বা সংগঠিত নির্বাচনী জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ভোটের রাতে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে এবং তাঁদের কাছ থেকে ২৪ হাজার শেকেলের বেশি নগদ অর্থ ও রা’আমের ব্যালট উদ্ধার করে। তবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক দিন লিভনে ঘটনাটিকে ‘অস্বাভাবিক’ কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, সন্দেহভাজনদের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই তাঁদের বাড়ির কাছ থেকে আটক করা হয়েছিল এবং ঘটনাটি তদন্তাধীন।
রা’আমের নেতা মনসুর আব্বাস নেতানিয়াহুর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর দল সম্পর্কে “মিথ্যা ও উসকানিমূলক” বক্তব্য দিচ্ছেন এবং ডানপন্থী ভোটারদের উজ্জীবিত করতেই এসব অভিযোগ ব্যবহার করছেন।
অন্যদিকে আইজেনকোটের দল অভিযোগ করেছে, নেতানিয়াহু নির্বাচনের ফল নিয়ে আগে থেকেই সন্দেহ তৈরি করে রাখার চেষ্টা করছেন, যাতে ফল তাঁর বিপক্ষে গেলে তা চ্যালেঞ্জ করার রাজনৈতিক ক্ষেত্র প্রস্তুত থাকে।
নির্বাচনী প্রচারেও নেতানিয়াহু বারবার বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে আরব দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর প্রচারণার অন্যতম স্লোগান ছিল, “হয় ডানপন্থা, নয় ফিলিস্তিন।”
আরব দল নিয়ে বিভক্ত বিরোধী শিবির
গাদি আইজেনকোট নিজে আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোট করার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি যেকোনো অংশীদারের জন্য কিছু শর্ত দিয়েছিলেন, যার মধ্যে ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনার বিষয় ছিল। এসব শর্ত অনেক ফিলিস্তিনি আইনপ্রণেতার অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে তাঁর জোটের শরিক ও ইসরায়েলের প্রধান বামপন্থী দল ডেমোক্র্যাটসের নেতা ইয়াইর গোলান প্রকাশ্যে আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
গোলান বলেছেন, “নেতানিয়াহু হেরে গেছেন। আমি ১২০ পর্যন্ত গুনতে জানি।” তাঁর বক্তব্য, ইহুদি ও আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহু যে বিভাজন তৈরি করেছেন, তা আর মেনে নেওয়া উচিত নয়। তিনি আরব নাগরিকদের ভোটকে ইহুদি নাগরিকদের ভোটের সমান মর্যাদা দেওয়ার আহ্বান জানান।
গোলানের হিসাবে, নেতানিয়াহুবিরোধী ও আরব দলগুলো মিলিয়ে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করা সম্ভব। তিনি একে “পরিবর্তনের সরকার” গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন, যেখানে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদেরও অংশীদার করা হবে।
তবে বিরোধী শিবিরের অন্য কয়েকটি দল এখনো আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিরোধিতা করছে। বিশেষ করে নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যানের মতো নেতারা নির্বাচনের আগে এমন সহযোগিতার সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন।
ফলে আরব দলগুলোর ১৯টি সম্ভাব্য আসন সরকার গঠনের সংখ্যার হিসাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সমর্থন গ্রহণ করা বিরোধী শিবিরের জন্য সহজ হবে না।
চূড়ান্ত ভোট গণনা এবং প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ কাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন, তার ওপরই পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকাংশে নির্ভর করবে। কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়তে না পারলে দীর্ঘ জোট আলোচনা, সংখ্যালঘু সরকার, জাতীয় ঐক্যের সরকার কিংবা শেষ পর্যন্ত নতুন নির্বাচন—সব সম্ভাবনাই সামনে থাকতে পারে।
সূত্র: এএফপি, মিডল ইস্ট আই, দ্য টাইমস অব ইসরায়েল

