প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ইরানের প্রতিপক্ষরা দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করা, ভয় দেখানো, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নতি স্বীকারে বাধ্য করা এবং বোমা হামলা চালিয়ে তাকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অথচ আঞ্চলিক ক্ষমতার রাজনীতিতে এক বিস্ময়কর উলটপালটের মধ্য দিয়ে এখন এমন তিনটি দেশ তেহরানে হাজির হয়েছে, যারা ঐতিহাসিকভাবেই ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেখানে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করছে সেই রাষ্ট্রের সঙ্গেই, যাকে একসময় প্রান্তিক করে রাখার কথা ছিল।
যে দেশকে তারা পরাজিত করতে পারেনি, সেই দেশটিকেই এখন উপেক্ষা করার সামর্থ্য তাদের নেই।
গতকাল সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কূটনৈতিক সৌজন্যের আড়ালে এই বৈঠকের কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট।
গত আগস্টে মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’র লক্ষ্য ছিল সুন্নি নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা জোট গড়ে তোলা। অথচ সেই জোটের প্রতিনিধিরাই এখন তেহরানে এসে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন, যা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন: ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা ইরানের স্বাধীন অবস্থানকে অসহনীয় মনে করলেও শুধু সেই কারণে দেশটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।
স্পষ্টতই, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে সুবিধামতো নিশ্চিহ্ন করা যায় না—এমন প্রমাণ দেওয়ার পর দেশটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
এখানেই সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ ও কৌশলগত পরাজয়ের মধ্যে পার্থক্য, যে পার্থক্যটি ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল বারবার গুলিয়ে ফেলে। বিপুল সামরিক শক্তি দিয়ে অবকাঠামো ধ্বংস করা, কর্মকর্তাদের হত্যা করা এবং মানুষের ওপর ভয়াবহ দুর্ভোগ চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এর মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে বশীভূত করা যায় না।
ইরান সামরিক সংঘাতের মুখেও টিকে রয়েছে, প্রতিশোধমূলক হামলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে আরেকটি যুদ্ধের সম্ভাব্য বিপর্যয়কর পরিণতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
প্রতিপক্ষকে যখন নিজের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ নতুন করে সাজাতে হয়, তখন টিকে থাকাটাই কৌশলগত বিজয়ে পরিণত হয়।
সৌদি আরবের হিসাব-নিকাশে বড় ধাক্কা
সৌদি আরবের জন্য এই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া বিশেষভাবে বিব্রতকর। কয়েক দশক ধরে রিয়াদ ইরানের প্রভাব মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে একধরনের নিরাপত্তাবিমা হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু ইয়েমেন সেই ধারণার অসারতা প্রকাশ করেছে।
ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন আনসারুল্লাহ দেখিয়েছে, উন্নত অস্ত্রভান্ডার থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বিশেষত, এমন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়, যারা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দিতে সক্ষম।
সৌদি রাজতন্ত্রের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, বিপুল সম্পদ এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষক। তা সত্ত্বেও ইয়েমেনের পাল্টা আঘাতের মুখে দেশটির দুর্বলতা দূর করা সম্ভব হয়নি।
এখন রিয়াদকে এমন একটি সংঘাত সামাল দিতে তেহরানের সহযোগিতা চাইতে হচ্ছে, যা তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েও সমাধান করা যায়নি।
বাস্তবতা হলো, মার্কিন অস্ত্র কেনা অনেক সহজ; কিন্তু কৌশলগত নিরাপত্তা কিনে নেওয়া ততটা সহজ নয়।
পাকিস্তান ও তুরস্কের দ্বিধা
পাকিস্তানের পরিস্থিতিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির এমন একটি সামরিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা প্রায়ই কৌশলগত নির্ভরশীলতাকে কূটনৈতিক বিচক্ষণতা হিসেবে উপস্থাপন করে। রিয়াদের প্রতি ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার এখন পাকিস্তানকে ইরান ও ইয়েমেনের সঙ্গে এমন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে ফেলছে, যা দেশটির ভৌগোলিক বাস্তবতা কিংবা জাতীয় স্বার্থ—কোনোটির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মক্কা চুক্তি সম্মিলিত নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে এর কম আলোচিত দিকটি হলো, অন্যের কৌশলগত ভুলের কারণে জোটের সব সদস্যকেই সম্মিলিত ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।
মুনিরকে এখন সৌদি পৃষ্ঠপোষকদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ইরানের শক্তি সম্পর্কে অস্বস্তিকর বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করতে হচ্ছে। এমন একটি সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি কঠিন দায়িত্ব, যে প্রতিষ্ঠান বারবার বিদেশি শক্তির সান্নিধ্যকে প্রকৃত কৌশলগত স্বাধীনতা বলে ভুল করেছে।
তুরস্কের হিসাব-নিকাশ কিছুটা ভিন্ন হলেও সিদ্ধান্তের জায়গাটি প্রায় একই। আঙ্কারা বোঝে, ন্যাটোর সদস্যপদ, সামরিক সক্ষমতা কিংবা আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা—কোনোটিই ভৌগোলিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারে না। ইরানকে অপ্রয়োজনীয় বা উপেক্ষণযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে কোনো বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
তবে মক্কা চুক্তির সবচেয়ে গভীর বৈপরীত্যটি এর সদস্যদের অবস্থানের মধ্যেই নিহিত।
একদিকে তারা সম্মিলিত প্রতিরক্ষার নিশ্চয়তা চায়, অন্যদিকে আরেকটি মার্কিন-ইসরায়েলি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চায়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, একজন সদস্যের ওপর আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। কিন্তু ইরানের পাল্টা আঘাত, ইয়েমেনে সংঘাতের বিস্তার এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর বিষয়গুলো সামনে এলে এমন অঙ্গীকারের আকর্ষণ অনেকটাই কমে যায়।
সম্মিলিত প্রতিরক্ষার ধারণা শুনতে চমৎকার, যতক্ষণ না কেউ তার সম্মিলিত মূল্য পরিশোধের হিসাব সামনে হাজির করে।
ইরানের সাফল্য এই নয় যে তার প্রতিবেশীরা দেশটির বিপ্লবী আদর্শ গ্রহণ করেছে। বাস্তবে তা ঘটেনি। সৌদি আরব এখনো ওয়াশিংটনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, পাকিস্তান এখনো নানা পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে এবং তুরস্ক ন্যাটোর কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে।
এর তাৎপর্য আরও গভীর। এই দেশগুলো ক্রমেই বুঝতে পারছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে ইরানকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা দেশটিকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার চেয়ে বেশি বিপদের কারণ হতে পারে।
এই উপলব্ধি মার্কিন নিরাপত্তাকৌশলের ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
দশকের পর দশক ধরে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে মার্কিন নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে এবং ইরানের শক্তিকে ঘিরে তাদের কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করেছে। অথচ এখন সেই দেশগুলোই এমন একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খুঁজছে, যাকে এত দিন অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
বৈপরীত্যটি গভীর। ইরানকে কয়েক দশক ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক রাজনীতিতে দেশটির অপরিহার্যতা আরও বাড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে।
আর তেহরান, নিজের কূটনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন একটি রাষ্ট্রের সংযম নিয়ে, অতিথিদের স্বাগত জানিয়েছে। বিজয়োল্লাস করে ঘোষণা দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। ঘটনাটিই নিজের তাৎপর্য যথেষ্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে।
মক্কা চুক্তির প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করতে এসেছিলেন। কিন্তু এখানে এসে তাঁরা নিজেদেরই ব্যর্থ কৌশলগত ধারণার পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন।
ইরানকে জোটে যোগ দিতে হয়নি; বরং জোটকেই ইরানের কাছে আসতে হয়েছে।
- অধ্যাপক জুনাইদ এস. আহমেদ: আইন, ধর্ম ও বিশ্ব রাজনীতি বিষয়ে অধ্যাপনা করেন এবং তিনি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ ইসলাম অ্যান্ড ডিকলোনাইজেশন (সিএসআইডি)-এর পরিচালক। সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

