ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে নতুন চাপে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টির জোট ছেড়ে বিরোধী শিবিরকে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে কট্টরপন্থি ইহুদি দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে)। এমনটি হলে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউটিজে নেতানিয়াহুর জোট থেকে বেরিয়ে আইজেনকোটের সম্ভাব্য সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে। তবে দলটি সরাসরি সরকারে যোগ দিতে চায় না।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউটিজে নতুন সরকারের অংশ হবে না। তবে সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও ভোট দেবে না। সংসদে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভোটাভুটি হলে দলটির সদস্যরা ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন। এতে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার সুযোগ পাবে।
চ্যানেল ১২-এর হিসাব অনুযায়ী, ইউটিজের সাতটি আসন বাদ দিলে নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা ৫৩ থেকে কমে ৪৬-এ দাঁড়াবে। অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আসন রয়েছে ৪৮টি। ফলে ইউটিজের অবস্থান পরিবর্তন হলে দুই শিবিরের মধ্যে ক্ষমতার সমীকরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
আইজেনকোটের পক্ষ থেকে ইসলামপন্থি রা’আম পার্টির সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। দলটি নেসেটে আটটি আসন পাবে বলে নির্বাচনী হিসাব থেকে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইউটিজে ও রা’আমের অবস্থান এবং বিরোধী জোটের সঙ্গে তাদের সমঝোতার ধরনই শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের পথ নির্ধারণ করবে।
সেনাবাহিনীতে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের নিয়োগ নিয়ে বিরোধ
নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ হয়েই ইউটিজে জোট ছাড়ার কথা বিবেচনা করছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দলটির অসন্তোষের প্রধান কারণ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইয়েশিভার শিক্ষার্থীদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আইন পাস না হওয়া।

কট্টরপন্থি ইহুদি দলটির দীর্ঘদিনের দাবি, ধর্মীয় শিক্ষায় নিয়োজিত ইয়েশিভার শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করা যাবে না। নেতানিয়াহু সরকার তাদের এই দাবি পূরণে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে পারেনি। এতে দলটির সঙ্গে ক্ষমতাসীন জোটের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।
ইউটিজের একটি সূত্র চ্যানেল ১২-কে বলেছে, “আমরা নেতানিয়াহুর কাছ থেকে কিছুই পাব না। তাঁর সঙ্গে আমাদের জোটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, বিশেষ করে এখন যখন তাঁর কাছে ৬১টি আসন নেই। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, আবারও নেসেটে একটি শক্তিশালী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম দল হয়ে ওঠা।”
দলটির এই অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতির প্রশ্নটি শুধু একটি নীতিগত বিরোধ নয়, বরং সরকার গঠনের সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাত আসনেই বদলে যেতে পারে ক্ষমতার হিসাব
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসনসংখ্যা ১২০। দেশটিতে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। এবারের নির্বাচনে কোনো দল বা জোটই এককভাবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন।
নেতানিয়াহুর জোটের ৫৩টি আসনের মধ্যে তাঁর নিজের দল লিকুদ পার্টি এককভাবে ২৭টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে ইউটিজে পেয়েছে সাতটি আসন। ফলে দলটি জোট থেকে সরে গেলে নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা কমে ৪৬-এ নেমে আসবে।
এই পরিস্থিতিতে আইজেনকোটের সামনে নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও তাঁকে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। রা’আমসহ আরব দলগুলোর অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে ইউটিজে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়ার ঘোষণা দেয়নি। বাইরে থেকে বিরোধী সরকারকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে তাদের আলোচনা ও বিবেচনা চলছে। ফলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে শেষ পর্যন্ত কী সমঝোতা হয়, তা এখনো অনিশ্চিত।

