দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। কয়েক দশকের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ ভোটের হার। মোট ৫৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৫ জন ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর এখন দেশটির রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সরকার গঠনের সমীকরণ। বিশেষ করে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন এবং বিরোধী দলগুলোর মধ্যে তাদের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে মতপার্থক্য নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।
চূড়ান্ত ফলে কোন দল কত আসন পেল
চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেয়েছে ২৭টি আসন। আইজেনকোটের ইয়াশার পেয়েছে ২১টি আসন। নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদের নেতৃত্বাধীন ‘টুগেদার’ (বেইয়াখাদ) পেয়েছে ১২টি আসন।
এ ছাড়া জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১১টি, ইয়াইর গোলানের নেতৃত্বাধীন দ্য ডেমোক্র্যাটস আটটি এবং আরব দল রা’আম আটটি আসন পেয়েছে। আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম পেয়েছে সাতটি করে আসন। একইভাবে ওৎজমা ইয়েহুদিত পেয়েছে সাতটি আসন। শাস ও রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টি পেয়েছে ছয়টি করে আসন।
নির্বাচনে আরও কয়েকটি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তারা কোনো আসন পায়নি। এসব দলের মধ্যে রয়েছে রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক পার্টি, পিপল অব ইসরায়েল পার্টি এবং দ্য চেরেডি পাবলিক পার্টি।
আগের সরকারে নেতানিয়াহুপন্থী জোটের নিয়ন্ত্রণে ছিল নেসেটের ৬৮টি আসন। নতুন নির্বাচনে তা কমে ৫৩টিতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন জোটের আসনসংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে।
অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে। আগের নেসেটে এই দুই দলের আসনসংখ্যা ছিল ১০। ফলে এবার তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ফল হস্তান্তর, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ
পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী ফল আগামী বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। তার আগে নির্বাচনী ফল নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগ ও সম্ভাব্য ভুলত্রুটি যাচাইয়ের কাজ শেষ করবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি।
ফল হস্তান্তরের পর প্রেসিডেন্ট হারজগ সরকার গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। কোন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে দলগুলোর সুপারিশ ও অবস্থান শুনবেন তিনি।
শুক্রবার ভোরে প্রকাশিত বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি তাদের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডিন লিভনের আগের দিনের বক্তব্যও পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের হিব্রু ভাষার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে দেশটির নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কাতার থেকে বিপুল অর্থ পাঠিয়ে আরব ভোটারদের ভোটের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে।
এ অভিযোগ সামনে আসার পর কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান নোয়াম সোলবার্গ অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতকে বিষয়টি তদন্ত করে দেখার নির্দেশ দেন।
তবে কাতার-সংশ্লিষ্ট প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ নাকচ করেছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি। বৃহস্পতিবার ডিন লিভনে বলেন, “দিনভর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।”
তিনি আরও জানান, তদন্তের কারণে প্রেসিডেন্টের কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়বে না। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, জনসংখ্যার কোনো নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্য করে এই তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে না।
সরকার গঠনে জটিলতা, নতুন নির্বাচনের আশঙ্কা
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সরকার গঠনের আলোচনা সহজ হবে না বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১টি। কিন্তু নেতানিয়াহুর জোট ৫৩ এবং আইজেনকোটের জোট ৪৮টি আসন পাওয়ায় দুই পক্ষেরই আরও সমর্থন প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে আইজেনকোটের জোটের শরিক দ্য ডেমোক্র্যাটস ছাড়া অন্য বিরোধী দলগুলো রা’আম কিংবা জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে। ফলে আরব দলগুলোর সমর্থন পেলেই বিরোধী শিবির সহজে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারবে, এমন পরিস্থিতি নেই।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জোটের মধ্যেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে আলোচনা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হলে নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে রাজনৈতিক আলোচনা চলমান থাকলেও আগামী ১০ নভেম্বর নেসেটের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে।
গত বুধবার প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের আরেকটি নির্বাচন এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আরেক দফা নির্বাচন এড়াতে আমাদের সম্ভাব্য সবকিছু করতে হবে, বিশেষ করে গতকালের ঘটনার পর। তাই যারা এখানে আসবেন, তাঁদের সবার কাছ থেকেই আমি খোলা মন নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার প্রত্যাশা করছি।”
নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট দুজনই পরবর্তী সরকার গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তবে চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী কোনো পক্ষেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় এখন তাঁদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করা।
ফলে ইসরায়েলের নির্বাচনী প্রতিযোগিতা শেষ হলেও ক্ষমতার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। বরং নতুন সরকার গঠনের আলোচনা, আরব দলগুলোর অবস্থান এবং বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যই আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণ করবে।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল, ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি

