কোনো আধিপত্যশালী শক্তির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত তৈরি হয় তখন, যখন তারা মনে করতে শুরু করে, যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করতে হলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধের প্রতিটি অপূর্ণ ফলাফল আরও বড় হামলার যুক্তি হয়ে উঠতে পারে। অতীতের যুদ্ধের ব্যয় বিজয় অর্জনের চাপ বাড়িয়ে দেয়, অথচ সেই বিজয় অর্জনের বাস্তব পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক সন্ধিক্ষণের দিকে এগোচ্ছে। যে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল নিজের ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতা প্রদর্শন করা, সেই যুদ্ধই এখন মার্কিন শক্তির বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
২২ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য আটলান্টিক-এর প্রতিবেদনে এই হিসাব-নিকাশের একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এবং সংশ্লিষ্ট আলোচনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি তুলে ধরেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। আরও এক দফা সামরিক হামলা চালানো হলে দেশটিতে সরকার পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও তাঁরা মনে করছেন। তবে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা শুরুর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। নতুন করে ফিরে এসেছে সেই পুরোনো প্রত্যাশা—আর একবার চাপ প্রয়োগ করলেই একটি চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়া যাবে।
এই প্রত্যাশা আসলে পুরোনো একটি ভুলেরই নতুন রূপ। ভুলটি হলো, প্রতিপক্ষ দুর্বল হয়ে পড়লেই তার আচরণ নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ইরান সামরিক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে দেশটি আক্রমণকারীর প্রত্যাশিত রাজনৈতিক পরিণতি মেনে নেবে। এই দুই সম্ভাবনার মধ্যবর্তী ব্যবধানেই সামরিক অভিযান একটি আধিপত্য রক্ষার জুয়ায় পরিণত হয়।
এই জুয়ার প্রকৃতি বুঝতে হলে ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য শত্রু’ ধারণাটির কার্যকারিতা সম্পর্কে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এই হিসাব অনুযায়ী, পরিচিত কোনো প্রতিপক্ষের উপস্থিতি সামরিক জোটগুলোকে সংগঠিত করতে, সামরিক উপস্থিতির যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে সহায়তা করে। আধিপত্যশালী শক্তির কাছে এমন শত্রুর গুরুত্ব নির্ভর করে এই প্রত্যাশার ওপর যে, হুমকির মাত্রা, সংঘাতের ব্যয় এবং সংঘাতের সমাপ্তির শর্ত—সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ইরান এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ, যার সঙ্গে সংঘাতের আঞ্চলিক তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশটিকে এতটাই দুর্বল বলে বিবেচনা করা হয় যে, তারা সংঘাতের নিয়মকানুন বদলে দেওয়ার মতো অবস্থানে যেতে পারবে না।
জার্মান আইনজ্ঞ ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কার্ল শ্মিটের সুরক্ষা ও আনুগত্যের ধারণা এই সম্পর্কটি বুঝতে সহায়তা করে। তাঁর বিশ্লেষণে, সুরক্ষা প্রদানকারী শক্তি শত্রু নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক আনুগত্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই যুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে দেখা যায়, নিরাপত্তা নেতৃত্বের দাবি নির্ভর করে এই প্রত্যাশার ওপর যে নেতৃত্বদানকারী শক্তি সুরক্ষা দিতে এবং বিপদ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম। ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য শত্রু’ শব্দবন্ধটি এই লেখার নিজস্ব ধারণা। শ্মিটের তত্ত্ব থেকে এখানে নেওয়া হয়েছে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের মধ্যকার সম্পর্কটি।
সমস্যার শুরু হয় তখন, যখন শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে প্রতিশ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যয় বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল মিত্ররাও তখন মার্কিন নীতির পরিণতির ঝুঁকিতে পড়ে। সামরিক অভিযান যদি দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং পাল্টা হামলার আশঙ্কা তৈরি করে, তাহলে ধ্বংস করার সামরিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকলেও সংকটের পরিণতি নিয়ন্ত্রণের দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধানেই আধিপত্যশালী শক্তির কর্তৃত্ব ক্ষয় হতে শুরু করে।
ইরাকের অভিজ্ঞতা ওয়াশিংটনকে এই ব্যবধান সম্পর্কে আরও সতর্ক করে তোলার কথা ছিল। সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। ইরানের ক্ষেত্রেও সামরিক হামলাকে রাজনৈতিক পতনে রূপান্তর করার প্রচেষ্টা গুরুতর বাধার মুখে পড়েছে। দেশটির প্রাতিষ্ঠানিক বহুত্ব, জাতীয় পরিচয়ের বিভিন্ন ভিত্তি এবং চাপের মুখে রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সরিয়ে দিলেই পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়বে, এমনটা নিশ্চিত নয়। কোনো সরকার দুর্বল হয়ে পড়লেও সিদ্ধান্ত নেওয়া ও প্রতিরোধ করার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
২০২৫ সালের জুনে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় এই সমস্যাটি সামনে এনেছে। ইরানের ক্ষয়ক্ষতি বাস্তব। কিন্তু এই ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে যে পরিণতি অর্জনের কথা ছিল—ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের নির্ধারিত ভবিষ্যৎ মেনে নিতে ইরানকে বাধ্য করা—তা এখনো বিতর্কিত। আলোচনা, হুমকি ও চাপ অব্যাহত থাকার বিষয়টিই প্রমাণ করে, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এখনো প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফলাফল নিশ্চিত করতে পারেনি।
২৭ আগস্ট প্রকাশিত রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে প্রাথমিক প্রত্যাশা ও পরবর্তী বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান তুলে ধরা হয়েছে। ট্রাম্প শুরুতে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের সামরিক অভিযানের কথা বলেছিলেন। অথচ ছয় মাস পর যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পরিস্থিতিতে পড়ে, যেখানে একদিকে চাপ বাড়ানোর চিন্তা, অন্যদিকে মুখরক্ষা করে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজা—দুইয়ের মধ্যে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত বোঝার জন্য এই ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে যুদ্ধ শুরু করা শক্তির কাছে যুদ্ধের সমাপ্তির অর্থই বদলে যেতে পারে।
এখানেই আধিপত্য রক্ষার জুয়ার প্রকৃত রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো প্রেসিডেন্ট যখন ইরানকে পিছু হটতে বাধ্য করার সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে যুক্ত করে ফেলেন, তখন ইরানের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাকে স্বীকার করে নেওয়া কোনো চুক্তিকে তাঁর কাছে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি বলে মনে হতে পারে। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন তখন মার্কিন হুমকির গ্রহণযোগ্যতা এবং মিত্রদের আস্থার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ফলে একটি নির্দিষ্ট সংঘাতকে বৃহত্তর ক্ষমতার দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণের ভার বহন করতে হয়।
এর অর্থ এই নয় যে, যুদ্ধ বন্ধ হলেই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের অবসান ঘটবে। বিপদটি নিহিত রয়েছে যুদ্ধের সমাপ্তিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, তার মধ্যে। ওয়াশিংটন যদি মনে করে, ইরানের প্রকাশ্য আত্মসমর্পণই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পরিণতি, তাহলে তারা নিজেরাই এমন সব বিকল্প পথ সংকুচিত করে ফেলবে, যেগুলোর মাধ্যমে মার্কিন শক্তি ও সম্পদ অক্ষুণ্ন রেখে সংঘাতের অবসান ঘটানো সম্ভব। এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় দফার বড় ধরনের সামরিক হামলাকে প্রথম দুই দফার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে।
প্রতিবারই প্রতিশ্রুতিটি প্রায় একই রকম থাকে—এবারই হবে শেষবারের মতো চাপ প্রয়োগ। কিন্তু প্রত্যাশিত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া না এলে আগের পদক্ষেপগুলোকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে আরও চাপ প্রয়োগের দাবি ওঠে। বৃহত্তর প্রতিদ্বন্দ্বীদের দিকে মনোযোগ দেওয়ার ইচ্ছাও এই চক্র থামাতে পারে না। কোনো নেতা যদি সংঘাত থেকে সরে আসাকে পরাজয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন, তাহলে সেই পরাজয় এড়ানোর চেষ্টায় তিনি সংঘাতের প্রতি নিজের অঙ্গীকার আরও গভীর করতে পারেন।
অন্যদিকে, সংঘাতের শুরুতে ইরান যে অবস্থানে ছিল, এখন আর দেশটি সেই স্থির লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নেই। হামলার অভিজ্ঞতা দেশটির হুমকি সম্পর্কে ধারণা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যক্রম টিকিয়ে রাখার কৌশল বদলে দিচ্ছে। কমান্ডারদের পরিবর্তে নতুন নেতৃত্ব আনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং প্রতিপক্ষের ওপর ব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার বিভিন্ন উপায় কাজে লাগানো—এসবই ইরানের অভিযোজনক্ষমতার অংশ। শুধু কতগুলো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হয়েছে, সেই হিসাব দিয়ে এই সক্ষমতার মূল্যায়ন করা যায় না।
তবে যুদ্ধের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। সাংগঠনিক কাঠামো টিকে থাকার পাশাপাশি সমাজে ক্লান্তি, অবকাঠামোর ক্ষতি এবং সম্পদের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা উভয় পক্ষকেই বদলে দেয়। আক্রমণকারীও তার কৌশল পরিবর্তন করতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে রাজনৈতিক বিজয় অর্জনের কঠিনতা নিয়ে আলোচনা করতে হলে ধ্বংসযজ্ঞকে প্রতিপক্ষের আনুগত্যে রূপান্তরের সমস্যাটির ওপরই গুরুত্ব দিতে হবে। অতীতের কোনো অভিজ্ঞতাই নিশ্চিত করে না যে, পরবর্তী দফার হামলাও ব্যর্থ হবে।
তেহরানের জন্য বিষয়টি আরও জটিল। যুদ্ধ সহ্য করার সক্ষমতা থাকলেই যে পরবর্তী যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানো যাবে, তা নয়। ইরান প্রতিপক্ষকে সহজে বিজয়ী হতে বাধা দিতে পারলেও বারবার হামলা, পুনর্গঠন এবং নতুন করে হুমকির মুখে পড়তে পারে। প্রতিবার টিকে থাকার জন্য দেশটির সমাজকে নতুন মূল্য দিতে হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্নও অমীমাংসিত থেকে যায়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি একটি অবস্থা ধীরে ধীরে অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি যদি অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকে এবং নতুন করে হামলার আশঙ্কা থেকে যায়, তাহলে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা যেকোনো সময় আবারও বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। রাষ্ট্র ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করবে, কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নির্ভর করবে প্রতিপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিরোধক্ষমতার প্রশ্নটি একটি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করার সীমা ছাড়িয়ে ভবিষ্যতে যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর প্রশ্নে পরিণত হয়।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের চলমান জুয়া ইরানের পারমাণবিক হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে। ইরানের নীতিনির্ধারকেরা যদি মনে করেন, দেশটির বিদ্যমান প্রতিরোধের উপায়গুলো যুদ্ধের ব্যয় বাড়াতে পারলেও নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকাতে পারছে না, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের যুক্তি আরও শক্তিশালী হবে। তাঁরা দাবি করতে পারেন, বারবার হামলার এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রতিরোধক্ষমতা প্রয়োজন।
এই বিতর্কের আভাস ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। ২০ অক্টোবর কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসে পুনঃপ্রকাশিত ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনের অংশে বলা হয়েছে, ইরানের কিছু কট্টরপন্থী রাজনীতিক, সংসদ সদস্য ও বিশ্লেষকের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা থেকে সরে আসা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। প্রতিবেদনটি ইরানের রাজনৈতিক বিতর্কের একটি অংশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তৃতীয় দফার সামরিক হামলাও যদি নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এই যুক্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে। পারমাণবিক নীতিতে পরিবর্তনের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের কাছে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আরও একটি প্রমাণ হিসেবে হাজির হবে যে, বোমা হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়া ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। সে ক্ষেত্রে চতুর্থ দফার হামলা ঠেকানোর উপায় হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রস্তাব সামনে আসতে পারে। যদিও এমন অস্ত্র অর্জন করলেই যে সেই লক্ষ্য নিশ্চিত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তবে এই হিসাব-নিকাশ থেকে বাস্তবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মধ্যে যথেষ্ট ব্যবধান রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রণোদনা তৈরি হওয়া, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করা এবং নির্ভরযোগ্য প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা—এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন ধাপ। ৭ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথকে সহজ বা অনিবার্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বরং সেই পথে এগোনোর চেষ্টা নিজেই আরও সামরিক হামলার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চাপ প্রয়োগের নীতির ভেতরের বৈপরীত্যটি স্পষ্ট। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্ত্র তৈরির পর্যায়ে পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার যুক্তিতে পরিচালিত সামরিক অভিযানই এমন ব্যক্তিদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে, যাঁরা ঠিক সেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রণোদনা বাড়ানো—দুটি ঘটনা একই সঙ্গে ঘটতে পারে। স্বল্পমেয়াদি সামরিক সাফল্য নিজে থেকে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান দিতে পারে না।
এই প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলেরও নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। দেশটির সরকার ইরানের সক্ষমতা পুনর্গঠনকে এমন একটি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে, যাকে আবারও সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে এর চেয়ে বিস্তৃত পরিণতি বিবেচনা করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং সংঘাতের অবসান ঘটানোর সক্ষমতা। এই দুই দেশের লক্ষ্যকে অভিন্ন হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকি হলো, ইরানের প্রতিটি পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টাই নতুন করে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের দাবি তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ নির্ভর করছে উভয় পক্ষের পরবর্তী সংঘাতের যৌক্তিকতা তৈরির ভিত্তি পরিবর্তনের ওপর। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর যাচাইযোগ্য সীমাবদ্ধতার সঙ্গে নতুন করে হামলার ঝুঁকি কমানোর বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা এবং প্রকৃত পুনর্গঠনের সুযোগ যুক্ত করতে হবে। তেহরানকে যদি কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তাহলে পারমাণবিক প্রতিরোধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের যুক্তি দুর্বল হবে না। বিপরীতে, ইরানের জন্য একটি টেকসই অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হলে এই হিসাব-নিকাশের ভিত্তি বদলে যেতে পারে।
নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ধরে রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ব্যর্থ যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং বৈশ্বিক অবস্থান বিসর্জন দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। শুধু ইরানের আত্মসমর্পণই মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে পারে—এমন অবস্থানে অনড় থাকাই যুক্তরাষ্ট্রের সেই বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্রমবর্ধমান ব্যয়বহুল পরিণতির সঙ্গে বেঁধে ফেলছে।
তৃতীয় দফার যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, ওয়াশিংটন আবারও প্রমাণ করতে যুদ্ধে ফিরতে পারে যে তাদের শত্রুকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অন্যদিকে, তেহরান বারবার যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে যে, নিজেদের ওপর হামলার ব্যয় স্থায়ীভাবে বদলে দিতে হলে তাদের ভিন্ন পথ বেছে নিতে হবে। শেষ পর্যন্ত আধিপত্য রক্ষার এই জুয়াই হয়তো ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সেই প্রণোদনাকে আরও শক্তিশালী করবে, যে প্রণোদনা নির্মূল করার লক্ষ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল।
- মাহদি নিকসেফাত মোতলাঘ, জননীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন গবেষক। সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

