ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগকে ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। তিনি জানিয়েছেন, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি তেহরানে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান নিয়ে এ মুহূর্তে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা নেই ইরানের।
শনিবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আরাকচি। এ সময় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তেহরানের শর্তগুলোও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, এসব শর্ত মেনে নেওয়া হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর পথ তৈরি হতে পারে।
আরাকচি জানান, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান সফরের এক দিন পর ইরানের একটি প্রতিনিধিদল দোহায় গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি পুনর্বহালের উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই যোগাযোগ চলছে। আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তাঁর একজন সহযোগীও কাতারে অবস্থান করছেন।
আরাকচি বলেন, ‘মার্কিন পক্ষ সংলাপের পথ খোলার এবং আরও বৃহত্তর পরিসরে বোঝাপড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই চিঠি পাঠানোর পেছনে ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য যদি বিবাদ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে তা তাদের আগের ভুলগুলোর তালিকায় আরও একটি নতুন সংযোজন হবে।’
‘মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের প্রয়োজন নেই’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসন্ন বৈঠকের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরকে গুরুত্ব দিতে রাজি নন আরাকচি। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের খবর মূলত গণমাধ্যমের অনুমান।
তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে যা কিছু প্রচার করা হয়েছে, তা কেবল সংবাদমাধ্যমের অনুমান। এই পর্যায়ে আমেরিকানদের সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। আমাদের শর্তগুলো পরিষ্কার। মধ্যস্থতাকারীরা এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কিংবা পরোক্ষ আলোচনায় বসবে কি না, তা নির্ভর করছে তেহরানের শর্তগুলো পূরণের ওপর বলেও জানান তিনি।
আরাকচি বলেন, ‘কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা আমাদের শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের শর্ত
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনায় প্রস্তাব বাস্তবায়নের সময়সীমা কমিয়ে আনার কথা জানিয়েছেন আরাকচি।
তিনি বলেন, ‘কাতারের পক্ষ থেকে ইরানের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সময়সীমা পাঁচ দিনে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের সঙ্গে আলোচনার পর আমরা এমন একটি প্রস্তাবে পৌঁছেছি, যার বাস্তবায়ন দুই দিনের মধ্যে করা সম্ভব।’
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামাবাদ সমঝোতার পর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো। পাশাপাশি তেল রপ্তানিতে দেওয়া ছাড় পুনর্বহাল এবং কাতারে থাকা অর্থসহ ইরানের সব অবরুদ্ধ তহবিল মুক্ত করার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরান ও ওমানের আলোচনায় নির্ধারিত রুটগুলোর স্বীকৃতি চায় তেহরান। একই সঙ্গে অন্য রুটগুলো বন্ধ রাখার দাবিও জানিয়েছে দেশটি।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আলোচনার অগ্রগতি সত্ত্বেও ইরানের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য কোনো নমনীয়তা দেখা যায়নি। নিজেদের আগের দাবিগুলোতেই অনড় রয়েছে দেশটি।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ওয়াশিংটন ইরানের তেল রপ্তানিতে ছাড় বহাল রাখার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। পাশাপাশি নতুন করে তেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ না করার কথাও ছিল। কিন্তু কয়েক মাস পর সমঝোতা স্মারকটি ভেস্তে গেলে যুক্তরাষ্ট্র সব ছাড় বাতিল করে দেয়।
ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও এখন আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরান দ্রুত প্রণালিটি খুলে দিক। দুই পক্ষই নিজেদের দাবি কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও কার্যকর দেখতে চায়।
‘সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানে নতুন করে হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না তেহরান। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাকচি বলেছেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরান প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছি না। সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য আমরা প্রস্তুত।’
ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা আমাদের অস্ত্রভাণ্ডার উন্নত করেছি, দুর্বলতাগুলো দূর করেছি এবং নতুন অস্ত্র পরীক্ষা করেছি। আমাদের বাহিনী সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রস্তুতিতে রয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরদিন, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এমএস নাউ। এ বিষয়ে অবগত পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তিনজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে তারা এ খবর প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে ওয়াশিংটন পারস্য উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোকে প্রস্তুত থাকার জন্য সতর্ক করেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব খবর এবং সম্ভাব্য হামলা নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলা জল্পনার প্রেক্ষাপটেই আরাকচি সামরিক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
এদিকে, ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন হামলার আশঙ্কার মধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাসনিমের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে যেকোনো শত্রুর হুমকির তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন খামেনি। এ ক্ষেত্রে জবাব দেওয়ার কোনো ‘ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা’ থাকা উচিত নয় বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

