‘মিনাপ’ অঞ্চলের চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকের বসবাস পাকিস্তানের। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, দৈনিক ৩ ডলারের কম আয়ের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা এ অঞ্চলের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪৮ শতাংশই পাকিস্তানের বাসিন্দা।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে পাকিস্তানের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে দেশটির রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
‘মিনাপ’ বা এমইএনএএপি হলো বিশ্বব্যাংকের একটি ভৌগোলিক শ্রেণিবিন্যাস। এর আওতায় রয়েছে পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান। অঞ্চলটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত অক্টোবরের প্রতিবেদনে বিভিন্ন তথ্য ও পূর্বাভাস তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে পুরো মিনাপ অঞ্চল বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সংঘাতের প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; পর্যটন, বিমান চলাচল ও সরবরাহব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে অনিশ্চয়তা বাড়ায় আর্থিক বাজার ও ব্যবসায়ীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অতীতে জ্বালানিসংকটের সময় সাধারণত তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো লাভবান হতো। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মিনাপ অঞ্চলের অর্থনীতি গড়ে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে তা গড়ে ২ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এই সংঘাতের প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এর ফলে পর্যটন, বিমান চলাচল ও সরবরাহব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক বাজার ও ব্যবসায়ীদের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটির ভিত্তিতে গত ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর শিরোনাম ছিল ‘আঞ্চলিক দারিদ্র্যের হার পাকিস্তানে সবচেয়ে বেশি’।
ডনের প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সংঘাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক প্রভাব মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকেরা ব্যস্ত থাকলেও অঞ্চলটিকে আরেকটি বড় পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। সেটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব।
বিশ্বব্যাংকের মতে, অঞ্চলটি বর্তমানে কোনো একক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না। বরং বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন গতিতে একাধিক পরিবর্তন ঘটছে। অধিকাংশ অর্থনীতিতে স্বল্প মেয়াদে এআইয়ের প্রভাব ব্যাপক কর্মসংস্থান বিলুপ্তির পরিবর্তে মূলত উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খাদ্যনিরাপত্তার পরিস্থিতিও অঞ্চলটির কয়েকটি দেশে উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা এবং ইয়েমেন প্রজাতন্ত্রের পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আফগানিস্তান, জিবুতি, লেবানন ও পাকিস্তানেও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের শেষ দিকে এল নিনিওর প্রভাব তীব্র হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের দামের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনের কারণে পাকিস্তান সরাসরি এ ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
দারিদ্র্যের বিস্তার নিয়ে বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, দৈনিক ৩ ডলারের কম আয়ের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মিনাপ অঞ্চলের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪৮ শতাংশ পাকিস্তানের। অন্যদিকে আফগানিস্তান, সিরিয়া ও ইয়েমেনে রয়েছে এ অঞ্চলের আরও ৪৭ শতাংশ দরিদ্র মানুষ।
মাথাপিছু জিডিপিতে পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে পাকিস্তান। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৯৭ ডলার ৩ সেন্ট। একই সময়ে পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ১ হাজার ৫৯৫ ডলার ৯ সেন্ট।
অর্থাৎ মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে ১ হাজার ১ ডলার ৪০ সেন্ট। অন্যদিকে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ২ হাজার ৭০২ ডলার ৫০ সেন্ট।

