যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগের দিন ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০ হাজারের বেশি ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট গণনা বন্ধের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এসব ভোটারের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন বলে অভিযোগ তুলেছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। তবে সোমবার জরুরি ভিত্তিতে করা আবেদনটি জমা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নাকচ করে দেন আদালত। সূত্র: রয়টার্স
এই সিদ্ধান্তের ফলে বিতর্কিত ব্যালটগুলো গণনা বন্ধ রাখার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ মুহূর্তের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে হাজারো ভোটারের ভোটাধিকার এবং ভোটের ফল নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরির উদ্যোগও বাধার মুখে পড়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরেকটি আইনি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে লড়ছে তাঁর রিপাবলিকান পার্টি। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া আবার ডেমোক্রেটিক পার্টির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচনের আগে অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সক্রিয় হলেও একাধিক গবেষণা ও অঙ্গরাজ্যগুলোর নিরীক্ষায় দেখা গেছে, অযোগ্য ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। বিশেষ করে অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার ঘটনা খুবই কম।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টের সংক্ষিপ্ত আদেশে আবেদন খারিজের পক্ষে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। জরুরি আবেদনসংক্রান্ত বিষয়ে আদালত সাধারণত এ ধরনের সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়ে থাকেন। কোনো বিচারপতিই প্রকাশ্যে সিদ্ধান্তটির বিরোধিতা করেননি।
এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদনের বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার কাছে কোনো জবাবও চাননি আদালত। জরুরি মামলায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে জবাব চাওয়া হলে সাধারণত বোঝা যায়, আদালত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট দলের এই নেতা বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের গণতন্ত্রের ওপর যে জঘন্য ও বিপজ্জনক আক্রমণ চালানো হচ্ছে, তার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত সব আমেরিকানের জন্য স্বস্তিদায়ক।”
তিনি আরও বলেন, “আগামীকাল (মঙ্গলবার) ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন যে অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করবে—যেমনটি আমরা সব সময় করে আসছি।”
এর আগে শুক্রবার একটি কেন্দ্রীয় আপিল আদালতও ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
২০ হাজার ভোট নিয়ে বিতর্ক
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, যেসব ভোটারের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তাঁদের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটগুলো অন্য ভোট থেকে আলাদা করে রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক কি না, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এসব ব্যালট গণনা করা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া আবেদনে বিচার বিভাগ বলেছিল, “ক্যালিফোর্নিয়া একবার বিতর্কিত ব্যালটগুলো বৈধ ব্যালটের সঙ্গে মিশিয়ে ফেললে সেগুলো আর আলাদা করে ফিরিয়ে আনার কোনো উপায় থাকবে না।”
তবে ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তারা এই দাবির বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার যে পদ্ধতি অনুসরণ করছে, তাতে ত্রুটি রয়েছে। ফলে বৈধ ভোটারদেরও ভুল করে অমার্কিন নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি রয়েছে।
২০ হাজার ভোটারের তালিকাটি তৈরি করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ। পরে তালিকাটি ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়।
গত ১৫ অক্টোবর বিচার বিভাগ কেন্দ্রীয় আদালতে মামলা করে। তাদের অভিযোগ ছিল, ১৯৯৬ সালের একটি কেন্দ্রীয় আইন কার্যকর করতে বাধা দিচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া। ওই আইনে যুক্তরাষ্ট্রের অমার্কিন নাগরিকদের কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচার বিভাগের দাবি, ক্যালিফোর্নিয়ার অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সর্বোচ্চতার নীতি লঙ্ঘন করছে। এই নীতি অনুযায়ী, সাধারণত কেন্দ্রীয় আইন অঙ্গরাজ্যের আইনের ওপর প্রাধান্য পায়।
অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার বক্তব্য, অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে অঙ্গরাজ্যটিতে শক্তিশালী আইনি সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ট্রাম্প প্রশাসনের মামলা ২০ হাজার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বিচারকের প্রশ্ন, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা কতটা?
এর আগে ২৮ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসের কেন্দ্রীয় জেলা আদালতের বিচারক ডেভিড কার্টার ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন খারিজ করে দেন।
নিজের আদেশে তিনি লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আগে কখনো নির্বাচনের ঠিক আগে কেন্দ্রীয় সরকার কোনো অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকারকে তাদের নিজস্ব সাংবিধানিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিত্যাগ করতে এবং নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেনি।”
ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিচারক কার্টার। তিনি উল্লেখ করেন, অন্য অঙ্গরাজ্যের ভোটার তালিকায় কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি যাঁদের অমার্কিন নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তাঁদের অনেকেই পরে যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ নাগরিক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন।
বিচারক আরও লেখেন, “যদি নির্বাহী বিভাগ অপ্রমাণিত অভিযোগের ভিত্তিতে ভোট বাতিল করতে পারে এবং চলমান নির্বাচনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, তাহলে আমাদের গণতন্ত্র বিপদের মুখে পড়বে।”
এরপর শুক্রবার সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক নবম সার্কিট আপিল আদালতও বিতর্কিত ব্যালট গণনা বন্ধের আবেদন নাকচ করেন।
আপিল আদালত নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনায় অঙ্গরাজ্যগুলোর সাংবিধানিক ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ায় নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যমান বিস্তৃত আইনি ব্যবস্থার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
এই ব্যবস্থায় কোনো ভোটার ভোট দেওয়ার অযোগ্য বলে প্রমাণিত হলে তাঁর নিবন্ধন বাতিল করার সুযোগ রয়েছে। ফলে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে সব বিতর্কিত ভোট একসঙ্গে আটকে রাখার প্রয়োজন নেই বলে ক্যালিফোর্নিয়ার পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়।
নির্বাচনে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর। তবে এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারেরও কিছু তদারকির ক্ষমতা রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার এই মামলা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরল হস্তক্ষেপের একটি উদাহরণ। একই সঙ্গে আদালতের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রহও এতে স্পষ্ট হয়েছে।
এর আগেও ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত করার চেষ্টা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই পদ্ধতিতে সাধারণত ডেমোক্র্যাট সমর্থক ভোটারদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি। তবে সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সেই উদ্যোগও নাকচ করে দেন।
এ ছাড়া আলাস্কায় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনসংক্রান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের একটি মামলাও রোববার একজন কেন্দ্রীয় বিচারক খারিজ করে দেন।
২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছিলেন ট্রাম্প। তবে তাঁর অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত উপ-অ্যাটর্নি জেনারেল ট্রেন্ট ম্যাককটার বলেন, “নির্বাচনের স্বচ্ছতা রক্ষা এবং কেন্দ্রীয় আইন কার্যকর নিশ্চিত করতে আমরা আইনি পথে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত রাখব।”
তবে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ফলে অন্তত ক্যালিফোর্নিয়ার বিতর্কিত ব্যালটগুলো গণনা বন্ধ রাখার প্রচেষ্টা আর এগোতে পারছে না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে এই রায় ভোটারদের অধিকার, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচনী কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

