যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত দুই বছরে বিশ্বরাজনীতিতে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, যেখানে মিত্রদেশ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী- কেউই তাঁর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারে না। কখনো শুল্কের হুমকি, কখনো সামরিক অভিযান, কখনো মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি মিলিয়ে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব অনেকটাই বদলে দিয়েছে। কিন্তু এবার সেই ট্রাম্পকেই নিজের দেশের ভোটারদের কাছে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন হচ্ছে, মধ্যবর্তী ঝড়ে ট্রাম্পের ক্ষমতা আইনি বেড়াজালে বন্দি হতে যাচ্ছে!
আজ ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে কোনো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু আগামী দুই বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে।
এবারের নির্বাচনকে বিশেষ করে তুলেছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতন, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ এবং ডেমোক্রেটদের বাড়তি নির্বাচনী সক্রিয়তা। রয়টার্স/ইপসোসের ২ নভেম্বর প্রকাশিত জরিপে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ৩২ শতাংশ উত্তরদাতা। একই জরিপে কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৬ শতাংশ, রিপাবলিকানদের পক্ষে ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ ডেমোক্রেটদের ব্যবধান ৮ শতাংশ।

তবে জনমত জরিপ আর নির্বাচনের ফল এক বিষয় নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে যেখানে প্রতিনিধি পরিষদের আসন নির্ধারিত হয় ৪৩৫টি পৃথক নির্বাচনী এলাকায় এবং সিনেটের লড়াই হয় অঙ্গরাজ্যভিত্তিক, সেখানে জাতীয় জরিপের ব্যবধান সরাসরি আসনসংখ্যায় প্রতিফলিত করা কঠিন।
তাই প্রশ্ন ডেমোক্রেটরা কি জিতবে-এমনটা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পতন কি এবার কংগ্রেসের ক্ষমতার সমীকরণও উল্টে দিতে যাচ্ছে?
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস, ভোটারদের ক্ষোভ কোথায়?
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে। নির্বাচনের সময় ভোটারদের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে কতটা স্বস্তি এসেছে? জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসনের ব্যয় কতটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে?
গ্যালাপের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, নিবন্ধিত ভোটারদের ৫০ শতাংশ অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবাকে তাঁদের ভোটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। ইরান পরিস্থিতিকেও ৪৭ শতাংশ ভোটার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। জ্বালানির দামকে ৪২ শতাংশ এবং অভিবাসনকে ৪০ শতাংশ ভোটার একইভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ, এবারের নির্বাচন শুধু ট্রাম্পের প্রতি ব্যক্তিগত সমর্থনের পরীক্ষা নয়; তাঁর প্রশাসনের অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতিরও মূল্যায়ন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ৮ অক্টোবরের জরিপেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ৩০ শতাংশে দাঁড়ানোর তথ্য উঠে আসে। জরিপে ৬৩ শতাংশ ভোটার বলেছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। তাঁদের মধ্যে ৪৪ শতাংশের ভোটের সিদ্ধান্তকে ট্রাম্পের বিরোধিতা প্রভাবিত করছে, বিপরীতে ১৯ শতাংশ তাঁর সমর্থনে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এখানে ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক সমস্যাটি হলো, তিনি নিজেই নির্বাচনের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেছেন। সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে স্থানীয় প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, অঙ্গরাজ্যের সমস্যা ও স্থানীয় অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এবার ট্রাম্পের নাম ব্যালটে না থাকলেও তাঁর শাসনামলের মূল্যায়নই নির্বাচনী প্রচারণার বড় অংশ দখল করে নিয়েছে।
এটাই ডেমোক্রেটদের বড় সুযোগ, তারা এই অসন্তোষকে কাজে লাগাতে চাইছে। তাদের বক্তব্য, ট্রাম্পের শুল্কনীতি, যুদ্ধের ব্যয় এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মার্কিন পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের যুক্তি, কঠোর বাণিজ্যনীতি ও নিরাপত্তা কৌশল দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবে।
অর্থাৎ, ভোটারদের সামনে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হাজির করা হলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে কোন ব্যাখ্যা বেশি গ্রহণযোগ্য হবে, সেটিই ট্রাম্পের জন্য বড় পরীক্ষা।
কংগ্রেসের দখল নিয়ে মহাযুদ্ধ
এই নির্বাচনের আসল ক্ষমতার লড়াই হচ্ছে কংগ্রেসের দুই কক্ষ- প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতে এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন এবং ফ্লোরিডা ও ওহাইওতে দুটি বিশেষ নির্বাচন। বর্তমানে রিপাবলিকানদের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত সংকীর্ণ। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, তাদের কার্যকর সমর্থন ২১৯টি আসনের কাছাকাছি, বিপরীতে ডেমোক্রেটদের ২১৪টি। ডেমোক্রেটদের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে অন্তত তিনটি আসনে নিট অগ্রগতি প্রয়োজন। অন্যদিকে সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি এবং ডেমোক্রেটদের সঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যসহ বিরোধী শিবিরের কার্যকর শক্তি ৪৭। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্রেটদের চারটি আসনে নিট অগ্রগতি অর্জন করতে হবে।
এই দুই কক্ষের লড়াই সমান গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাতীয় জরিপে ডেমোক্রেটরা এগিয়ে থাকলেও সিনেটের নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতা বড় বাধা। কিছু অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ভোটভিত্তি রয়েছে। ফলে প্রতিনিধি পরিষদে নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও সিনেটের হিসাব অনেক বেশি জটিল। রয়টার্সের ২৫ অক্টোবরের বিশ্লেষণেও প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটদের অগ্রগতির সম্ভাবনা এবং সিনেটে অনিশ্চয়তার কথাও বলা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে আগাম ভোটও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন গবেষণাগারের হিসাব অনুযায়ী, ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৫ কোটি ৩৬ লাখের বেশি মানুষ আগাম ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে ২ কোটি ৯৮ লাখের বেশি সরাসরি আগাম কেন্দ্রে এবং প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগাম ভোটের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৭৭ লাখ বেশি।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ডেমোক্রেটরা যদি কংগ্রেসের একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণও পায়, তাহলে ট্রাম্পের ক্ষমতা কতটা সীমিত হবে?
উত্তর হলো, অনেকটাই।

কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ বাজেট ও সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে সিনেটের অনুমোদন ছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও চুক্তি কার্যকর করা যায় না। কংগ্রেসের কমিটিগুলো প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তদন্ত করতে পারে, কর্মকর্তাদের তলব করতে পারে এবং নথিপত্র চাইতে পারে। যা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ বাড়াবে।
ইরান যুদ্ধ এখন ট্রাম্পের রাজনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়েছে
এই নির্বাচনে ইরান যুদ্ধ একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়, জ্বালানির বাজার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
গ্যালাপের জরিপে ৪৭ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার ইরান পরিস্থিতিকে তাঁদের ভোটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন।
ডেমোক্রেটদের অভিযোগ, ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন করদাতাদের অর্থের ওপর চাপ বাড়বে। সামরিক অভিযান, অস্ত্রের ব্যবহার, সেনা মোতায়েন এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার ব্যয় শেষ পর্যন্ত ফেডারেল বাজেটের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আবার হরমুজ প্রণালি ও আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
রিপাবলিকানদের পাল্টা যুক্তি হলো, ইরানের সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। তাদের মতে, সামরিক চাপ তৈরি না করলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কিন্তু রাজনৈতিক সমস্যা হলো, যুদ্ধের কৌশলগত লক্ষ্য যত বড়ই হোক, সাধারণ ভোটার শেষ পর্যন্ত নিজের পকেটের হিসাব করেন। জ্বালানি, খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও বাড়িভাড়ার ব্যয় বাড়লে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় বড় যুক্তি তাঁদের কাছে কম গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
এখানে ট্রাম্পের জন্য আরেকটি বিপদ রয়েছে। তিনি নির্বাচনের প্রচারণায় নিজেকে শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির নেতা হিসেবে তুলে ধরলেও, দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধেই রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
তবে ইরান যুদ্ধের কারণে কতটা মূল্যস্ফীতি হয়েছে, তা আলাদা করে নির্ধারণ করা সহজ নয়। জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজার, উৎপাদন, সরবরাহ, মুদ্রানীতি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করে। তাই সব মূল্যবৃদ্ধির দায় এককভাবে যুদ্ধের ওপর চাপানো কঠিন।
প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পের জন্য সামরিক শক্তি প্রদর্শন কী রাজনৈতিকভাবে লাভজনক, নাকি যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্যই তাঁর দলের জন্য নির্বাচনী বোঝা হয়ে উঠবে?

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সেনাবাহিনীর মহড়া। ছবি: এএফপি
ডেমোক্রেটরা জিতলে ট্রাম্পের সামনে কী অপেক্ষা করছে?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হতে পারে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার- কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। ট্রাম্প তাঁর সাংবিধানিক নির্বাহী ক্ষমতা, ভেটো এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ধরে রাখবেন।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথ কঠিন হয়ে যাবে। বাজেট, করনীতি, অভিবাসন আইন, সামরিক ব্যয় এবং নতুন আইন প্রণয়নে ডেমোক্রেটদের বাধার মুখে পড়তে হবে তাঁকে।
এর চেয়েও বড় বিষয় হলো ‘তদন্তের ক্ষমতা’। প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্রেটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে শুনানি, তদন্ত এবং নথিপত্র তলবের সুযোগ তৈরি হবে। অভিবাসনবিষয়ক অভিযান, সরকারি অর্থের ব্যবহার, ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে তদন্তের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
এখানে অভিশংসনের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ডেমোক্রেটরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব আনতে পারবেন। কিন্তু তাঁকে পদ থেকে সরাতে হলে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই সমর্থন পাওয়া অনেক কঠিন। তাই অভিশংসনের রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং বাস্তবে প্রেসিডেন্টকে অপসারণ- দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প তাঁর বাকি মেয়াদে আইন প্রণয়ন, বাজেট এবং প্রশাসনিক নিয়োগের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। এটি তাঁর দলের অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্বও আরও শক্তিশালী করতে পারে।

আমেরিকার ভোটে বিশ্ব কেন নজর রাখছে?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তির অধিকারী দেশটির কংগ্রেসে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে তার প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা, জলবায়ু নীতি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতেও।
ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক, ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয়, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং ইরানকে ঘিরে মার্কিন নীতি- এসব ক্ষেত্রেই কংগ্রেসের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নতুন সামরিক সহায়তা, প্রতিরক্ষা বাজেট এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বাণিজ্যিক চাপকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। কিন্তু এই নীতির ফলে মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী উভয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে এসব নীতির অর্থনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত এবং রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারেন।
এ ছাড়া ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়েও এবারের ফলের প্রভাব থাকবে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভালো ফল পেলে ডেমোক্রেটরা নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি ও নেতৃত্বের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সামনে আনার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব তাঁর দলের ভেতরে আরও শক্তিশালী হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের ভাগ্য কোন দিকে?
এবারের নির্বাচনের ফল কী হবে, তা ভোট গণনার আগে নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে ডেমোক্রেটরা জাতীয় পর্যায়ে এগিয়ে থাকলেও রিপাবলিকানদের সিনেটের কাঠামোগত সুবিধা রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপেও ডেমোক্রেট সমর্থকদের নির্বাচনী আগ্রহ তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। তবে অতীতের নির্বাচনে জনমত জরিপের সঙ্গে চূড়ান্ত ফলের পার্থক্যও মনে করিয়ে দেয়, জরিপ সবকিছু নির্ধারণ করতে পারে না।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের আসন হারানোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মাত্র দুটি মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন বাড়াতে পেরেছে। তবে ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনের ফল ভাগাভাগি করতে পারে না।
এবার ট্রাম্পের সামনে দুটি আলাদা পরীক্ষা রয়েছে। প্রথমটি নির্বাচনী- রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবেন কি না। দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক- নিজের দলের ভেতরে এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কতটা অবশিষ্ট রয়েছে।
বিশ্বকে শুল্ক, সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে নিজের অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করা ট্রাম্প এবার নিজ দেশের ভোটারদের কাছেই মূল্যায়িত হচ্ছেন। তাঁর জনপ্রিয়তা কমেছে, যুদ্ধ ও অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে, আর ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য সংগঠিত প্রচারণা চালাচ্ছে।

কিন্তু ট্রাম্প কি সত্যিই রাজনৈতিক ক্ষমতার খেলায় কংগ্রেসের ‘বন্দি’ হতে যাচ্ছেন? নাকি শেষ মুহূর্তে মার্কিন ভোটাররা আবারও তাঁর দলকে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ দিয়ে দেবেন?
উত্তর মিলবে ভোটের ফল প্রকাশের পর। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত- রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের একটি কক্ষও হারালে ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের শাসন আগের মতো নির্বিঘ্ন থাকবে না। আর ডেমোক্রেটরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার সমীকরণে পুরো উল্টে যাবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স/ইপসোস (২ নভেম্বর ২০২৬), অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (৩ নভেম্বর ২০২৬), পিউ রিসার্চ সেন্টার (৮ অক্টোবর ২০২৬), গ্যালাপ (২৯ অক্টোবর ২০২৬), ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টারি রিসার্চ সার্ভিস, ইউনিভার্সিটি অফ ফ্লোরিডা নির্বাচনী ল্যাব এবং বিভিন্ন জরিপ।

