ক্ষমতায় ফিরে প্রায় দুই বছরে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিতে একের পর এক পরিবর্তন এনেছেন। কখনো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, আবার কখনো প্রতিপক্ষের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছেন তিনি। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল তার সেই নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন বাধা তৈরি করতে পারে। যদিও পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক বিষয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার হাতে এখনো উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা করবেন, নাকি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ইরানে স্বস্তি, তবে নতুন হামলার আশঙ্কাও রয়েছে
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়কে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছে ইরান। দীর্ঘ আট মাস ধরে চলা সংঘাত ও এর অর্থনৈতিক প্রভাব মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ বাড়িয়েছে বলে মনে করছে তেহরান।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধি নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ক্ষতির অন্যতম কারণ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বিষয়টি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নির্বাচনী পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের বড় ভূমিকা রয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন, মার্কিন সরকার যদি জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে বাইরের শক্তির স্বার্থে কাজ করে, তাহলে তাকে কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
তবে নির্বাচনের ফলাফল দেখে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছে না ইরান।
দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জানিয়েছেন, মার্কিন নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আনবে বলে যারা ধারণা করছেন, তারা ভুল করছেন।
এদিকে নতুন করে বড় ধরনের মার্কিন সামরিক হামলার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প একদিকে ইরানের ওপর আরও কঠোর আঘাত হানার সম্ভাবনার কথা বলেছেন, অন্যদিকে তাৎক্ষণিকভাবে সংঘাত বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই বলেও জানিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও বাড়ছে। কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন প্রস্তাব বিনিময় হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনের আগেই ইরান জানিয়েছিল, তাদের সাতটি শর্ত মেনে নেওয়া হলে দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তারা প্রস্তুত।
আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক আলি ভায়েজের মতে, ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন তার সামনে দুটি পথ রয়েছে। একটি হলো সমঝোতার মাধ্যমে সংঘাত কমিয়ে রাজনৈতিক সাফল্য দাবি করা। অন্যটি হলো সামরিক অভিযান জোরদার করে নিজের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা।
চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক সানাম ভাকিল মনে করেন, নির্বাচনের ফল ইরানকে আলোচনায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। তবে তাতে দেশটির সংকট পুরোপুরি দূর হবে না। আপাতত বড় ধরনের শান্তিচুক্তির পরিবর্তে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সীমিত সমঝোতার সম্ভাবনাই বেশি।
ইসরায়েলের জন্য নতুন উদ্বেগ, বদলাতে পারে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ইসরায়েলের জন্যও বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ভোটের দিনই ট্রাম্প ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তা হঠাৎ বন্ধ করার ঘোষণা দেন। এর পরপরই কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের জয় ইসরায়েলের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সমর্থন পেয়ে আসছিল ইসরায়েল। কিন্তু গাজা যুদ্ধ এবং সেখানে বিপুল প্রাণহানির ঘটনায় মার্কিন রাজনীতিতে সেই সমর্থন ক্রমেই দুর্বল হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের বড় একটি অংশ আগে থেকেই ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছিল। সাম্প্রতিক সময়ে রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মুখে রয়েছে।
তার আশঙ্কা, সামরিক সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থানও ভবিষ্যতে বদলে যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ইসরায়েলের সংবাদপত্র জেরুজালেম পোস্টের সাবেক প্রধান সম্পাদক ইয়াকভ কাটজও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, সামরিক সহায়তা বন্ধের পর অস্ত্র বিক্রিতে বাধা, নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব এবং যৌথ অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে অর্থায়ন কমানোর মতো পদক্ষেপ সামনে আসতে পারে।
ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব আরও জোরালো হয়েছে। অনেক মার্কিন ভোটার মনে করছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু এখনো ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে যুদ্ধের বিস্তার এবং জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিজ দেশেও রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের নির্বাচনে তিনি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন।
তবে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। ফলে সরকার গঠনে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে।
ইসরায়েলের বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ার গোলান দেশটির বর্তমান নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি এড়াতে ইসরায়েলের দ্রুত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
ইউক্রেনের সামনে নতুন সুযোগ, তবে রাশিয়াকে নিয়ে শঙ্কা
মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়াকে ইউক্রেনের জন্য সম্ভাব্য স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের প্রশ্নে ট্রাম্পের বিভিন্ন দাবি এবং ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়ানোর নীতি কিয়েভকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে।
ট্রাম্প একাধিকবার জেলেনস্কির নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি খাতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ্রহও দেখিয়েছেন।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক সহায়তার ওপর ইউক্রেনের নির্ভরতা দেশটির জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এ কারণে কিয়েভের নীতিনির্ধারকেরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ইউক্রেন সরকারের পক্ষ থেকে বড় ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে প্রেসিডেন্টের দপ্তরের কর্মকর্তা সের্গেই কিসলিৎসিয়া জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, ইউক্রেন তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
তিনি আরও জানিয়েছেন, ইউক্রেন আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাবে। পাশাপাশি নতুন কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য নির্বাহী সিদ্ধান্ত মোকাবিলার প্রস্তুতিও নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব কমতে থাকলে ইউক্রেনের ওপর যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে নেওয়ার চাপ কিছুটা কমতে পারে।
তবে এতে সব সমস্যার সমাধান হবে না। ইউক্রেন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র, অর্থনৈতিক সহায়তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
এর পাশাপাশি নতুন একটি ঝুঁকিও রয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হয়তো মনে করতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘনিয়ে আসার আগে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য তার হাতে সীমিত সময় রয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান আবার ইউক্রেনের পক্ষে পরিবর্তিত হতে পারে, এমন হিসাব থেকে মস্কো সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার চেষ্টা করতে পারে।
তাই ট্রাম্পের নির্বাচনী বিপর্যয় ইউক্রেনের জন্য কিছুটা রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করলেও যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
বিশ্বরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের অপেক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে ট্রাম্পের পরবর্তী কৌশল।
ইরান চাইছে নির্বাচনী চাপকে কাজে লাগিয়ে কূটনৈতিক আলোচনায় সুবিধা আদায় করতে। ইসরায়েল উদ্বিগ্ন দীর্ঘদিনের মার্কিন সহায়তা ও নিরাপত্তা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে। অন্যদিকে, ইউক্রেন আশা করছে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিবর্তন তাদের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করবে।
তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের হাতে এখনো সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার প্রভাব শেষ হয়ে যাচ্ছে না।
পরবর্তী কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে ইরানে সংঘাত কমবে নাকি বাড়বে, ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক কতটা পরিবর্তিত হবে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক উদ্যোগ কোন দিকে এগোবে।

