মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত অঙ্গরাজ্যে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। বিশেষ করে টেক্সাস, কানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো অঙ্গরাজ্যে তাদের সাফল্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। এসব ফলাফল মার্কিন রাজনীতিতে ভোটারদের পরিবর্তিত মনোভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ২৫৭টি আসনে জয় পেয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। সে সময় রিপাবলিকানদের আসন ছিল ১৭৮টি। এবারের নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল সেই সময়ের সঙ্গে তুলনার সুযোগ তৈরি করেছে।
সিনেটেও ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। ৪ নভেম্বরের হিসাবে উচ্চকক্ষে দলটি ৫৪টি আসন নিশ্চিত করে, যেখানে রিপাবলিকানদের দখলে ছিল ৪৪টি। বাকি দুটি আসনের ফল তখনো চূড়ান্ত হয়নি। ২০০৮ সালে বারাক ওবামার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের সময় ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে ৫৬টি আসন পেয়েছিল। এরপর এত বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর অর্জন করতে পারেনি দলটি।
সাউথ ক্যারোলাইনায় ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো সিনেট আসনে জয় পেয়েছেন একজন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী। সেখানে ট্রাম্প-সমর্থিত ডারলিন গ্রাহামকে হারিয়েছেন অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট রয় কুপার।
টেক্সাসেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান-প্রভাবিত এই অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো। অন্যদিকে মিশিগানে সাবেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সায়েদ।
যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোনের মতে, রিপাবলিকানদের জন্য এই ফলাফল বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা বহন করছে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া প্রার্থীরা শুধু উদারপন্থি ডেমোক্র্যাটদের কাছেই নয়, মধ্যপন্থি প্রার্থীদের কাছেও পরাজিত হয়েছেন।
বিশেষ করে টেক্সাসের ফলাফলকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। সেখানে জেমস তালারিকো প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন ফেদারস্টোন। একই অঙ্গরাজ্যে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়ে ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসার বিজয়ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। নির্বাচনের আগে আসনসীমা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে প্রতিনিধি পরিষদে আরও পাঁচটি আসন পাওয়ার আশা করেছিল রিপাবলিকানরা। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফল তাদের প্রত্যাশার বিপরীত হয়েছে।
ফেদারস্টোনের ধারণা, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে যাওয়ায় হোয়াইট হাউসের সঙ্গে আইনসভার সম্পর্কেও পরিবর্তন আসতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ বাড়তে পারে। এমনকি প্রশাসনের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জার্মান মার্শাল ফান্ডের কর্মকর্তা সুধা ডেভিড-উইলপ মনে করেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে ভোটারদের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়। তার মতে, এবারের ফলাফল ডেমোক্র্যাটদের জন্য নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন শক্তিশালী এমন কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের জয় রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। ট্রাম্পের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠী এখনো সক্রিয় থাকলেও তার রাজনৈতিক আন্দোলনের ভেতরে বিভক্তি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকানদের নতুন কৌশল নির্ধারণের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল রিপাবলিকানদের জন্য পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়েছে দলটি। ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান সিনেটর অ্যাশলি মুডি ডেমোক্র্যাট অ্যাঞ্জি নিক্সনকে পরাজিত করেছেন। একই অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট ডেভিড জলিকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন রিপাবলিকান বায়রন ডোনাল্ডস। এর মাধ্যমে ফ্লোরিডার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হওয়ার ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন তিনি।
ওয়াইয়োমিংয়ে রিপাবলিকান হ্যারিয়েট হেগম্যান সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। আলাবামায় গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট ডাগ জোনসকে পরাজিত করেছেন টমি টিউবারভিল। এ ছাড়া আইডাহো, আরকানসাস, লুইজিয়ানা, সাউথ ডাকোটা, নেব্রাস্কা, কেনটাকি ও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াসহ আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে জয় পেয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থীরা।
একইভাবে ২০০৮ সালে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর ২০১০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছিল রিপাবলিকানরা। যদিও সে সময় সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছিল ডেমোক্র্যাটরা। ফলে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, একটি নির্বাচনে বড় পরাজয়ের অর্থ দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নয়।
এবারের নির্বাচনে অবশ্য অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতিও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন বিশ্লেষণে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর আমেরিকা কর্মসূচির পরিচালক লরেল র্যাপের মতে, সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে পররাষ্ট্রনীতি প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে না। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। আন্তর্জাতিক সংঘাতের সঙ্গে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সম্পর্ক তৈরি করে দেখছেন অনেক মার্কিন ভোটার।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। ভোটারদের একটি বড় অংশ সরকারের নীতিতে পরিবর্তন প্রত্যাশা করছেন বলেও মনে করেন তিনি।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের সব ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাচ্ছে না। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। ফলে আগামী দুই বছরে আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক তদারকিতে ডেমোক্র্যাটদের ভূমিকা বাড়লেও বৈদেশিক নীতিতে ট্রাম্পের প্রভাব পুরোপুরি কমে যাবে না।
অন্যদিকে কংগ্রেসের দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ফলে ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের ওপর তদারকি জোরদার এবং বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা করার সুযোগ পাবে। তবে নতুন আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের অনুমোদন কিংবা তার আপত্তি অতিক্রম করার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

