যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধকে নির্বাচনী বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে ভ্যান্সের প্রকাশ্য মন্তব্য ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে তিনি ট্রাম্পের নীতি থেকে নিজের অবস্থান কিছুটা আলাদা করার চেষ্টা করছেন কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় ৬০০ শব্দের একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন ভ্যান্স। সেখানে তিনি স্বীকার করেন, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া ভোটারদের একটি অংশ এবার রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দেননি। নির্বাচনে দলের পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি সরাসরি ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ তোলেন।
ভ্যান্সের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও নির্বাচনের পর যুদ্ধের প্রভাবের কথা বলেছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ার পর রিপাবলিকান নেতৃত্বের মধ্যে এই আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচন কঠিন হলেও এবারের ফলাফল দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্সের অবস্থান অবশ্য পুরোপুরি নতুন নয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক হামলা শুরু করার পর প্রকাশ্যে তিনি প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন। তবে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় যুদ্ধের বিষয়ে তার আপত্তি ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এত দিন সেই মতপার্থক্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আসেনি। কিন্তু নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর ভ্যান্সের বক্তব্য নতুন তাৎপর্য পেয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধের জন্য দীর্ঘ সময় সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর রাজনৈতিক মূল্য দেওয়া যুক্তিসংগত কি না।
ভ্যান্সের এই মন্তব্যকে সরাসরি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখছেন না সবাই। তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এর মাধ্যমে তিনি যুদ্ধের বিষয়ে নিজের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট করেছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়াও ছিল উল্লেখযোগ্য। সাধারণত নিজের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নীতিগত সমর্থন প্রত্যাশা করলেও এবার ভ্যান্সের মন্তব্যের বিরোধিতা করেননি তিনি।
নির্বাচনের পর দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প স্বীকার করেন, ইরান যুদ্ধ মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে একই ধরনের পরিস্থিতি আবার তৈরি হলে তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন বলেও জানান।
ভ্যান্সের মন্তব্য সম্পর্কে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ নিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্টের অবস্থান সম্পর্কে তিনি আগে থেকেই অবগত। ভ্যান্সের বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেটিই তার প্রশাসনের লক্ষ্য।
ফলে যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দুই নেতার বক্তব্যে মিল থাকলেও সামরিক সিদ্ধান্তটির প্রয়োজনীয়তা ও ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে তাদের অবস্থানে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ভ্যান্সের এই অবস্থান ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কারণ, রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে তার নাম আগে থেকেই আলোচনায় রয়েছে। তবে তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতার ঘোষণা দেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পররাষ্ট্রনীতিবিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল বাইম্যানের মতে, ভ্যান্সের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে ট্রাম্পের সঙ্গে রাজনৈতিক পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যায়। তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে ট্রাম্পের সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাও তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ভ্যান্সের বক্তব্যে এই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টার কিছু লক্ষণ রয়েছে। তিনি সরাসরি ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেননি। বরং ভোটারদের অসন্তোষ, নির্বাচনী জরিপ এবং যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাবকে সামনে এনেছেন। রিপাবলিকান কৌশলবিদ অ্যাশলি ডেভিসের ধারণা, ভ্যান্সের বক্তব্যের মাধ্যমে দলের ভেতরে তার অবস্থান কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিও যাচাই করা হতে পারে।
নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভবিষ্যতে রিপাবলিকানদের কী বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, সে সম্পর্কেও চারটি বিষয় তুলে ধরেছেন ভ্যান্স। তার বক্তব্যে ইরান যুদ্ধের অবসান, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
এই বিষয়গুলো ভ্যান্সের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশেষ করে বিদেশে সামরিক সম্পৃক্ততা সীমিত রাখা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে তিনি অতীতেও বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে সাম্প্রতিক বিবৃতিকে তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন কিছু পর্যবেক্ষক।
তবে ভ্যান্সের বক্তব্য নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের একাংশের মতে, ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলোর দায় এড়াতে পারেন না। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের মধ্যেও কেউ কেউ মনে করেন, নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য শুধু ইরান যুদ্ধকে দায়ী করলে ভোটারদের অন্যান্য উদ্বেগ যথাযথ গুরুত্ব পাবে না।
ভ্যান্সের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক কতটা বদলেছে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের আগে ভ্যান্স তার বিবৃতিটি ট্রাম্পকে দেখিয়েছিলেন। এই তথ্য দুই নেতার মধ্যে মতপার্থক্যের প্রকৃতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এদিকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে কাকে সমর্থন করবেন, সে বিষয়ে ট্রাম্প এখনো কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেননি। বিভিন্ন সময়ে তিনি জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর প্রশংসা করেছেন। তবে দলের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে কাউকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানাননি।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন না। ফলে ট্রাম্পের পর রিপাবলিকান দলের নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা চলমান রয়েছে।
পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এখনো দুই বছর বাকি। ভ্যান্স প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। তার সহযোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি এখনো বিবেচনার পর্যায়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্সের সাম্প্রতিক মন্তব্য রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনা নতুন করে সামনে এনেছে। এটি ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকৃত নীতিগত দূরত্বের প্রকাশ, নাকি নির্বাচনী পরাজয়ের পর ভোটারদের উদ্বেগ তুলে ধরার প্রচেষ্টা—তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে রিপাবলিকান দলের নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণের আলোচনায় ভ্যান্সের অবস্থান যে গুরুত্ব পাচ্ছে, তা সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট।

