ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রয়োজনে ইরানের অবশিষ্ট অংশও ধ্বংস করে দেওয়া হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। একই সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে দেশটির পুনর্গঠনে অন্তত ২৫ বছর সময় লাগতে পারে বলেও দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, পরবর্তী করণীয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। তবে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ভবিষ্যতে ইরান যাতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায় ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের আরও ক্ষয়ক্ষতি হোক, সেটি তিনি চান না। তবে পরিস্থিতির কারণে দেশটির অবশিষ্ট অংশেও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। পরবর্তী সময়ে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা খুব শিগগিরই জানা যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের এমন বক্তব্য নতুন করে সামরিক অভিযানের আশঙ্কা তৈরি করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন হামলার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি বা পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়নি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরান ওয়াশিংটনের কাছে কোনো নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া ইরান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
তবে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে কোনো নতুন সমঝোতা হয়েছে কি না, কিংবা কূটনৈতিক আলোচনায় কতটা অগ্রগতি এসেছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দেননি ট্রাম্প।
এদিকে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দেওয়ায় ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কংগ্রেস সদস্য ইয়াসামিন আনসারি। অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের এই প্রতিনিধি মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আনসারি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প আবারও প্রায় ৯ কোটি মানুষের একটি দেশকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিচ্ছেন। তার মতে, এ ধরনের হুমকি মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধেও ডেমোক্র্যাটদের দ্রুত ও কার্যকর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আনসারি মনে করেন, সামরিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আগেই মার্কিন প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের ফলাফল নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরছেন ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা। তাদের দাবি, এই যুদ্ধ ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।
ইরানের আইনপ্রণেতা মাহমুদ নাবাভিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক বক্তব্যে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েও নিজেদের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
তার অভিযোগ, এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল করা, দেশটিকে বিভক্ত করা, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকার উৎখাত এবং পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ইরানের প্রতিরোধের কারণে সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
নাবাভিয়ানের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়ার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অঞ্চলটির মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে তার এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
ইরানি এই আইনপ্রণেতা আরও দাবি করেন, যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানও দুর্বল হয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে দেশটির অন্যতম কৌশলগত সুবিধা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথকে কেন্দ্র করে ইরানের অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে বলে তার দাবি।
এমনকি যুদ্ধের পর ইরান একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বলেও মন্তব্য করেন নাবাভিয়ান। তবে এটি তার রাজনৈতিক মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
এদিকে ইরানের বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার হোসেইন তাইয়েব বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিকল্পনা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বরং যুদ্ধের কারণে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
তেহরানে অনুষ্ঠিত ১৯তম আন্তর্জাতিক রেজিস্ট্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তাইয়েব বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভেতরেই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী দিনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনের প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে বলে তিনি মনে করেন।
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, তাইয়েব যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ ও শিল্পীদের যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। তার দাবি, বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা এবং বিদেশে সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন জনগণের একটি অংশ দীর্ঘদিনের সামরিক সংঘাতে ক্লান্ত এবং বিদেশে যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে ইরানি নেতাদের এসব বক্তব্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অবস্থানের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ওয়াশিংটন দাবি করছে, ইরানের পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলায় সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে তেহরান এই সংঘাতকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরছে।
এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় জরুরি অর্থনৈতিক প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ইরান। দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান গোলামরেজা জালালি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অর্থনীতি সচল রাখার জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন।
তার এই আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং জরুরি সেবা পরিচালনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রেখেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং উত্তেজনা কমাতে চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেও আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার প্রচেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের নতুন হুমকি ইরানকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। একদিকে ওয়াশিংটন নতুন সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রেখেছে, অন্যদিকে তেহরান নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা তুলে ধরার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

