যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, দুটির ওপরই কর্তৃত্ব হারাতে চলেছে। গণনা এখনো চলছে। সর্বশেষ ফলাফলে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ব্যবধান আরও বাড়ছে। আল-জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এই ভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝপথে তাঁর প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের মোট আসন ৪৩৫টি। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৫৩টিতে জিতেছে ডেমোক্র্যাটরা, আর রিপাবলিকানরা পেয়েছে ১৫৭টি। বাকি ২৫টি আসনের ফল এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এর মধ্যে আটটিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন, আর ১৭টিতে এগিয়ে রিপাবলিকানরা। এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকলে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের আসন দাঁড়াবে ২৬১টিতে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ২১৮টি। ফলে এই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ইতিমধ্যেই তাদের হাতে নিশ্চিত হয়ে গেছে।
উচ্চকক্ষ সিনেটের চিত্রও একই। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৫১টি আসন লাগে। ডেমোক্র্যাটরা এরই মধ্যে ৫৪টি আসন নিশ্চিত করেছে। রিপাবলিকানদের আসন ৪৪টি। বাকি দুটি আসনের ফল ঘোষণা হয়নি। দুটিতেই এগিয়ে আছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। ফলে চূড়ান্ত হিসাবে সিনেটে তাদের আসনসংখ্যা ৫৬-তে পৌঁছাতে পারে।
সিনেটের এই হিসাবে এবার ভোট না হওয়া আসনও ধরা হয়েছে। এ বছর ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা ৩৪টি এবং রিপাবলিকানদের দখলে থাকা ৩১টি আসনে নির্বাচন হয়নি। ভোট হয়েছে ৩৫টি আসনে। এর মধ্যে ২০টিতে জিতেছে ডেমোক্র্যাটরা, ১৩টিতে রিপাবলিকানরা। সিনেটররা নির্বাচিত হন ছয় বছরের জন্য। তাই প্রতি দুই বছর অন্তর কক্ষটির সব আসনে নয়, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনেই ভোট হয় প্রতি দুই বছর পরপর। এবারও ৪৩৫টি আসনেই লড়াই হয়েছে।
এই ফলাফলের রাজনৈতিক প্রভাব ওয়াশিংটনে বেশ গভীর হতে পারে। কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাবে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের কাজের ওপর নজরদারি অনেক বাড়বে। বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত শুরু করা, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো এবং প্রয়োজনীয় নথি তলব করার ক্ষমতাও তাদের হাতে আসবে। ক্ষমতাসীন দলের জন্য এটি বাড়তি চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য। নতুন আইন পাস করা কিংবা সরকারের নীতি বাস্তবায়নে এখন থেকে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতায় বসতে হতে পারে। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং প্রশাসনের নানা পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া তাই আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। মেয়াদের বাকি দুই বছর নীতিনির্ধারণে বড় বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের সব সিদ্ধান্ত আটকে দিতে পারবে না। কোনো বিলে ট্রাম্প ভেটো দিতে পারেন। সেই ভেটো বাতিল করতে হলে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে। এই বাধা পেরোনো সহজ নয়। ফলে প্রেসিডেন্টের হাতে শেষ পর্যন্ত কিছু ক্ষমতা অটুট থাকছে।
ক্ষমতার এই হাতবদল অবশ্য এখনই কার্যকর হচ্ছে না। নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হবে ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি। ততদিন পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ থাকছে রিপাবলিকানদের হাতেই। অর্থাৎ নতুন সমীকরণের পূর্ণ প্রভাব দেখা যাবে নতুন বছরের শুরু থেকে।
মার্কিন রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রায়ই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়। এবারের ফল সেই বিবেচনায় ট্রাম্প ও তাঁর দলের জন্য স্পষ্ট বার্তা বহন করছে। দুই কক্ষেই বড় ব্যবধানে হারের পর রিপাবলিকান শিবিরকে আগামী দুই বছরের কৌশল নতুন করে সাজাতে হবে। আর ডেমোক্র্যাটদের সামনে সুযোগের পাশাপাশি দায়িত্বও বেড়েছে। কংগ্রেসে নিজেদের শক্তি কীভাবে ব্যবহার করবে, তার ওপরই নির্ভর করবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তাদের জনসমর্থনের ভিত।

