যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর অংশ হিসেবে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলারকে নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে পরিচিত মিলারকে হোয়াইট হাউসের অন্যতম ক্ষমতাধর পদে বসানোর সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান আরও কঠোর করার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার এই নিয়োগের ঘোষণা আসে। এত দিন চিফ অব স্টাফের দায়িত্বে থাকা সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন মিলার। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য একাধিক তদন্ত মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্রাম্প। এমন পরিস্থিতিতেই নতুন দায়িত্ব নিচ্ছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ এই সহযোগী।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এটিই ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম বড় ধরনের কর্মী রদবদল। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানদের বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পেছনের কৌশল নিয়ে ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শুক্রবার সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে আরও কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি ইতিবাচক জবাব দেন। ট্রাম্প বলেন, ‘এটিই শেষ নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার মন্ত্রিসভাকে ভালোবাসি। আমি মনে করি তারা ভালো। তবে আমি হয়তো কিছু রদবদল করব। আমি অবশ্য বলতে চাই না কাদের বরখাস্ত করা হবে।’
নির্বাচনী পরাজয়ের পর আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত
মিলার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় ট্রাম্পকে তাঁর অভ্যন্তরীণ নীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নে নির্বাহী ক্ষমতার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প মিলারকে তাঁর অন্যতম বিশ্বস্ত উপদেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে বিদায়ী চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের কাজের প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, সোমবার থেকে মিলারের নতুন দায়িত্ব কার্যকর হবে।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, মিলারের নিয়োগের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে ট্রাম্প তাঁর নীতিগুলো পুনর্বিবেচনার কোনো পরিকল্পনা করছেন না। বরং সবচেয়ে অনুগত সহযোগীদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে তাঁদের পুরস্কৃত করছেন।
কোটি কোটি মার্কিন ভোটার ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পরও প্রশাসনের নীতিগত অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই বলে মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা। তাঁর ভাষায়, ‘তিনি তাঁর পথ পরিবর্তন করছেন না।’
ট্রাম্প অবশ্য জানিয়েছেন, কংগ্রেসের ক্যাপিটল হিলে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি আগ্রহী। তবে কঠোর সমালোচক ও আপসহীন অবস্থানের জন্য পরিচিত মিলারকে চিফ অব স্টাফ করায় প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থান আরও সংঘাতমুখী হতে পারে বলে মনে করছেন হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তা। তাঁদের মতে, অভিবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন মিলার।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনসমর্থন প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল। এ সময় নিজের রাজনৈতিক ও যোগাযোগ কার্যক্রম নিয়েও অসন্তুষ্ট ছিলেন তিনি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ায় হোয়াইট হাউসকে আরও ‘আক্রমণাত্মক’ হতে হবে।
নিয়োগ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মিলার লিখেছেন, ‘এখন লক্ষ্য আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট। আমাদের প্রেসিডেন্টের সমর্থনে এবং এই মহিমান্বিত প্রজাতন্ত্র রক্ষায় সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই করুন।’
অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের নতুন ডেমোক্র্যাটিক স্পিকার হতে যাওয়া হাকিম জেফ্রিজ এক্সে দেওয়া পোস্টে মিলারকে ‘বেপরোয়া চরমপন্থী’ বলে অভিহিত করেছেন।
অভিবাসনবিরোধী অভিযানের অন্যতম রূপকার
৪১ বছর বয়সী স্টিফেন মিলার ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ট্রাম্পের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদ—উভয় সময়েই দায়িত্ব পালন করা হাতেগোনা কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে তিনি একজন।
২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে মিলার আনুষ্ঠানিকভাবে সুসি ওয়াইলসের অধীনে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নীতির বড় অংশে তাঁর ব্যাপক প্রভাব ছিল। প্রেসিডেন্টের কাছ থেকেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছিলেন।
দৈনিক তিন হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসনবিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পরিচিত মিলার। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় মুখোশধারী মার্কিন অভিবাসন কর্মকর্তাদের দেশজুড়ে অভিযান চালাতে দেখা গেছে। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই, এমন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও বেড়েছে।
তবে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে এই অভিযান নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখা যায়নি। চলতি সপ্তাহের শুরুতে সম্পন্ন হওয়া রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের মাত্র ৩৬ শতাংশ এই অভিযানকে সমর্থন করেছেন। বিপরীতে ৫৪ শতাংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট অ্যান্ড গভর্নমেন্ট রিফর্ম কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য রবার্ট গার্সিয়া জানিয়েছেন, মিলারের অভিবাসননীতির বিভিন্ন দিক তদন্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। তিনি বলেন, ‘স্টিফেন মিলারের এখন আইনজীবী নিয়োগ করা উচিত।’
ট্রাম্পের ফেডারেল আমলাতন্ত্র পুনর্গঠনের অভিযানেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন মিলার। বিশ্ববিদ্যালয়, বৈচিত্র্যবিষয়ক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রশাসনের বিরোধের পেছনেও তাঁকে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।
পররাষ্ট্রনীতিতেও কঠোর অবস্থান
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপগুলোর জোরালো সমর্থক হিসেবে পরিচিত মিলার। ক্যারিবীয় অঞ্চল ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পরিবহনের সন্দেহে থাকা নৌযানগুলোর ওপর প্রাণঘাতী সামরিক হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। এসব অভিযান নিয়ে বিভিন্ন আইনি প্রশ্নও উঠেছে।
এ ছাড়া ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রশংসা করেছেন মিলার। তেহরানকে দুর্বল করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা কমাতে নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
তবে ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে চলতি সপ্তাহের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রতি ভোটারদের নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পাওয়ার পরও মিলার তাঁর আগের অবস্থানে কতটা অনড় থাকবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মার্ক শর্ট মনে করেন, মিলারকে নিয়োগ দিয়ে ট্রাম্প এমন একজনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন, যিনি তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত।
শর্ট বলেন, মিলারের মাধ্যমে ট্রাম্প এমন একজন সহযোগীকে পাচ্ছেন, যিনি অভিবাসননীতি এবং কংগ্রেসের তদন্তের মতো বিষয়ে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে লড়াই করতে প্রস্তুত।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, ‘এটি দ্বিদলীয় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে খুব বড় কোনো প্রত্যাশার ইঙ্গিত দেয় না।’
এদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে ডেমোক্র্যাটদের অভিশংসনের দাবির মুখে থাকা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘দেশপ্রেমিকদের হাতেই নিয়ন্ত্রণ’ লিখে মিলারের পদোন্নতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর এই প্রতিক্রিয়া মিলারকে আরও ক্ষমতাধর পদে বসানো নিয়ে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের একাংশের সমর্থনের প্রতিফলন।
ওয়াইলসের বিদায়, সামনে আরও রদবদল?
হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ পদটি মার্কিন প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সাধারণত এই কর্মকর্তা প্রেসিডেন্টের প্রধান সহযোগী ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন। হোয়াইট হাউসের কর্মীদের পরিচালনা, প্রেসিডেন্টের সময়সূচি নির্ধারণ এবং বিভিন্ন সরকারি বিভাগ ও আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের দায়িত্বও তাঁর ওপর থাকে।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তার মতে, বৃহস্পতিবার রাতে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া ৬৯ বছর বয়সী সুসি ওয়াইলস এখন ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব সামলাবেন।
ফ্লোরিডার অভিজ্ঞ এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ পদে দায়িত্ব পালন করা প্রথম নারী। কয়েক দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এই দায়িত্বে এসেছিলেন। ট্রাম্পের আগের সহযোগীদের তুলনায় প্রশাসনে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যও প্রশংসিত হয়েছিলেন তিনি।
চলতি বছরের শুরুতে স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক চিকিৎসা চলার সময়ও দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছিলেন ওয়াইলস। ট্রাম্পের নীতিগত সিদ্ধান্তকে খুব কমই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করতেন তিনি। তবে বিশৃঙ্খল প্রশাসনিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। এ কারণে হোয়াইট হাউসে তাঁকে যুক্তির প্রতীক হিসেবেও বিবেচনা করা হতো।
তাঁর বিদায়ের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনের অভ্যন্তরে সেই ভারসাম্য কে বজায় রাখবেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত, চারজন চিফ অব স্টাফ পরিবর্তন করেছিলেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এক মেয়াদে এতবার এই পদে পরিবর্তন অস্বাভাবিক। সে সময় প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাঁরা হিমশিম খেয়েছিলেন বলে মনে করা হতো।
এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের ধাক্কার পর মিলারকে চিফ অব স্টাফ করার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নীতিতে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের নিয়েও রদবদলের সম্ভাবনা খোলা রেখেছেন প্রেসিডেন্ট। ফলে হোয়াইট হাউসে আগামী দিনগুলোতে আরও পরিবর্তন আসতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স

