কিন্তু এবার পরিস্থিতি আগের মতো নয়। আগের দুই দফা যুদ্ধ থেকে ইরান সরাসরি সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। পাশাপাশি নতুন সংঘাত মোকাবিলায় নিজেদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করার, পাল্টা জবাবের বিভিন্ন কৌশল তৈরি করার এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতি অনুযায়ী বাস্তবসম্মত লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রস্তুত করার সময় পেয়েছে তেহরান। ফলে নতুন কোনো সংঘাত শুরু হলে তার প্রেক্ষাপট আগের দুই যুদ্ধের মতো হবে না।
আরও প্রস্তুত ইরান
আগের দুই দফা যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা, তাদের হামলার কৌশল এবং নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা পেয়েছে তেহরান। এরপর এসব দুর্বলতার কিছুটা কাটিয়ে ওঠা এবং সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে ইরান।
এ ক্ষেত্রে আকস্মিক হামলার ঝুঁকি কমে আসার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
আগের যুদ্ধগুলোতে প্রাথমিক হামলার সময় ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর কিছু অংশ অপ্রস্তুত অবস্থায় আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু এবার ইরান তার রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের নিরাপত্তা জোরদার করার যথেষ্ট সময় পেয়েছে।
আগের সংঘাতগুলোর তুলনায় এখন সামরিক কমান্ডার ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সুরক্ষাব্যবস্থা অনেক বেশি শক্তিশালী হওয়ার কথা। এর অর্থ এই নয় যে, ইরান সব ধরনের সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে পারবে। তবে আগের মতো একই মাত্রায় আকস্মিক হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে এসেছে।
দুই দফা যুদ্ধের সামগ্রিক সামরিক ও নিরাপত্তা অভিজ্ঞতা থেকেও ইরান শিক্ষা নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোথায় কোথায় দুর্বলতা রয়েছে এবং নিজেদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে কীভাবে সেসব দুর্বলতায় আঘাত হানা যায়, সে সম্পর্কে তেহরানের ধারণা এখন অনেক বেশি স্পষ্ট।
নতুন সংঘাতে এই অভিজ্ঞতা ইরানের পাল্টা জবাবকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। আগের সামরিক অভিযানগুলো পর্যালোচনা করে কোন কৌশল কার্যকর হয়েছিল, কোনটি হয়নি এবং কীভাবে আরও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নির্ধারণের সময় পেয়েছে দেশটি।
এসব পরিবর্তনের অর্থ হলো, নতুন কোনো যুদ্ধ আগের দুই দফা সংঘাতের মতো পরিস্থিতিতে শুরু হবে না। ইরান এখন তুলনামূলকভাবে বেশি প্রস্তুত, আকস্মিক হামলার ঝুঁকিতে কম অরক্ষিত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের জবাব দেওয়ার বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ।
নতুন যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে পারে বৃহত্তর সংঘাত
মনে হচ্ছে, পরবর্তী দফার যুদ্ধে সংঘাত আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে সংঘাতের মাত্রা বাড়ানোর নিজস্ব কৌশল ইরানেরও রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা গত ৩১ অক্টোবর যেমনটি উল্লেখ করেছেন, নতুন যুদ্ধ আগের সংঘাতের মতো একই লক্ষ্যবস্তু ও ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আটকে নাও থাকতে পারে। বরং হামলা হলে ইরানের জবাব হবে ‘তাৎক্ষণিক, কার্যকর এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাহীন’। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি তাদের হামলার পরিধি বাড়ায়, তাহলে তেহরানও পাল্টা জবাবের ক্ষেত্র বিস্তৃত করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইরানের সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা হলে দেশটি পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বিবেচনা করতে পারে। এতে আঞ্চলিক সব দেশের জন্য যুদ্ধের ব্যয় ও ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন অবস্থায় ফেলবে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক আঞ্চলিক মিত্র তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। তাদের জ্বালানি রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং অক্ষত অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃহত্তর পরিসরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে এসব স্বার্থ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক মিত্রদের কাছ থেকে যুদ্ধ বন্ধ করার চাপের মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে ওয়াশিংটন তার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে না পারলেও মিত্ররা সংঘাতের অবসান চাইতে পারে। এতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা সীমিত হয়ে আসতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ও নতুন তেলসংকটের আশঙ্কা
হরমুজ প্রণালি এখনো ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শক্তি। আগের যুদ্ধের পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের পরিস্থিতিতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তেলের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনো বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে।
নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে এবং ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে আরও বিধিনিষেধ আরোপ করলে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের তেলসংকট তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক চাপ ইতিমধ্যেই সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব তুলে ধরছে। সংঘাত আরও তীব্র হলে এবং তেল সরবরাহে নতুন করে বাধা সৃষ্টি হলে এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত থাকা চাপ আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে তেল ও জ্বালানির দাম আরও দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এতে ওয়াশিংটন কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখে পড়বে। একদিকে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হবে, অন্যদিকে মোকাবিলা করতে হবে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এমন যুদ্ধে ইরান ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিশ্চিতভাবেই বড় ধরনের তেলসংকট তৈরি করার সক্ষমতাও দেশটির রয়েছে।
চাপ সৃষ্টির অন্যান্য উপায়
তেলের বাইরে বৈশ্বিক বাজার, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও চাপ তৈরির আরও কিছু উপায় রয়েছে ইরানের হাতে। এর মধ্যে একটি হলো সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ইন্টারনেট কেবল বা সাবমেরিন ক্যাবলে বিঘ্ন ঘটানোর সম্ভাবনা।
এসব কেবলের মাধ্যমে আর্থিক তথ্য আদান-প্রদান হয় এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, বাণিজ্য ও ডিজিটাল সেবা পরিচালিত হয়। এগুলোর কোনো গুরুতর ক্ষতি হলে আর্থিক লেনদেন ও বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এমনকি কয়েক দিনের সাময়িক বিচ্ছিন্নতাও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও আর্থিক ক্ষতি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিটকয়েনসহ অন্যান্য ডিজিটাল সম্পদ ইন্টারনেট সংযোগ এবং লেনদেনের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকারের ওপর নির্ভরশীল।
এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার সময়ের চেয়ে এর ফলে সৃষ্ট বিঘ্নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কয়েক ঘণ্টার জন্যও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বাজারে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, যা বড় ধরনের দরপতনের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বিটকয়েনের দাম কমে ২০ হাজার ডলারের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এতে ক্রিপ্টো বাজারের বড় একটি অংশের মূল্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। অবশ্য একই ধরনের বিঘ্ন অন্যান্য আর্থিক বাজারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যার পরিণতি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুতর হতে পারে।
পরিশেষে, নতুন একটি যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে ইরানকে দুর্বল করার আরেকটি সুযোগ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরান এখন আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত। আগের সংঘাত থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং যুদ্ধের ঝুঁকি ও কৌশল সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা দেশটির হাতে রয়েছে। হামলার পরিধি আরও বাড়ানো হলে ইরানও তার পাল্টা জবাবের ক্ষেত্র বিস্তৃত করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি, বৈশ্বিক তেলের বাজার এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা—সবকিছুই ওয়াশিংটনের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরির উপাদান হয়ে উঠতে পারে। ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়বে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেরও বৃহত্তর সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিণতি মোকাবিলা করতে হবে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো, নিজেদের প্রধান লক্ষ্য অর্জন করতে না পেরেও যুক্তরাষ্ট্র কি এই বিপুল ব্যয় বহন করতে পারবে? নতুন যুদ্ধ যদি জ্বালানিসংকট, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এবং মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার অবনতি ঘটায়, তাহলে সংঘাত শেষে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই আরও দুর্বল অবস্থানে চলে যেতে পারে।
ইরানকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া সামরিক অভিযান শেষ পর্যন্ত শুধু নিষ্ফলই প্রমাণিত হতে পারে না, বরং এমন বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ, তার মিত্রদের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
- মোহাম্মদ আমিন আহমাদি: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে একজন পিএইচডি শিক্ষার্থী। সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

