আমি একজন ব্রিটিশ-মিশরীয় শিশু বিশেষজ্ঞ। আমি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গাজায় গিয়েছি, স্থানীয় চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করেছি এবং ইসরায়েলের অবরোধ ও বোমাবর্ষণের ফলে শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব দেখেছি।
আমি জানি, প্রতিরোধযোগ্য শিশু মৃত্যুর সাক্ষী হওয়া কাকে বলে কিন্তু আমার জীবদ্দশায় আমি এমন পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা কখনো দেখিনি- আর না এমন ঠান্ডা নির্লিপ্ততা তাদের কাছ থেকে যারা আন্তর্জাতিক আইন ও শিশু অধিকার নিয়ে কথা বলে থাকে।
গত কয়েক দিনে গাজায় অনাহারে ভোগা শিশুদের মুখগুলো ব্রিটিশ পত্রিকার পাতায় ছেয়ে গেছে: কঙ্কালসার শিশুদের ফাঁকা চোখ, কান্নার শক্তিহীন টলোমলো বাচ্চা, মায়ের কোলে নিঃশ্বাস হারানো শিশু। মনে হচ্ছে ব্রিটিশ মিডিয়া যেন হঠাৎ করেই আবিষ্কার করল যে গাজায় শিশুদের অভুক্ত রাখা হচ্ছে।
কিন্তু আমাদের মতো যারা শিশুদের নিয়ে কাজ করি, যারা গাজার চিকিৎসকদের সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলেছি, যারা গত নয় মাস ধরে সরকারের ও প্রতিষ্ঠানের কাছে অনুরোধ করে চলেছি কিছু করবার জন্য- এই বিভীষিকা আমাদের কাছে নতুন নয়।
এটি একটি উদ্দেশ্যমূলক, মানবতাবিরোধী অভিযানের অনিবার্য পরিণতি- যা ব্রিটিশ মূলধারার মিডিয়ার অনুমোদিত, ব্রিটিশ সরকারের ছত্রছায়ায় পরিচালিত এবং এক বর্ণবাদী রাষ্ট্রের হাতে নির্বিচারে সংঘটিত।
মিডিয়ার মদত-
এই মুহূর্তে জাতিকে যেসব দৃশ্য হতবাক করছে, তা হঠাৎ করে আসেনি। এটি এমন একটি গল্পের শেষ অধ্যায়, যার লেখক ছিলেন যুক্তরাজ্যের মিডিয়াই।
এখন যখন শিশুরা ক্যামেরার সামনেই অনাহারে মারা যাচ্ছে, তখনই এই সব প্রতিষ্ঠান সরে দাঁড়াতে শুরু করেছে—নৈতিক কারণে নয়, বরং নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য।
২০ মাস ধরে- বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে- ব্রিটিশ পত্রিকা, সম্প্রচার মাধ্যম এবং রাজনীতিবিদরা ইসরায়েলি সরকারের ভাষ্য প্রায় হুবহু পুনরাবৃত্তি করে এসেছে: মানব ঢাল, সন্ত্রাসী অবকাঠামো, কোনো দুর্ভিক্ষ নেই, হামাস খাদ্য লুকিয়ে রেখেছে, ইসরায়েল তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
প্রতিটি অজুহাতই ব্যবহার করা হয়েছে দুই মিলিয়ন মানুষ- যার অর্ধেকই শিশু—এর সমষ্টিগত শাস্তিকে যৌক্তিক দেখাতে। এই গল্পগুলো নিরীহ ছিল না। এগুলো ছিল সেই অবিশ্বাসের ভিত্তি, যার ওপর গণহত্যা গড়ে উঠেছে। এগুলো ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধকে আড়াল দিয়েছে।
এসবই ফেলে দিয়েছে ফিলিস্তিনি চিকিৎসকদের, জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের, মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের সাক্ষ্য- যারা বিশ্বাস করতে বলছিলেন।
এসবই তৈরি করেছে জাতিগত নিধনের জন্য জনসম্মতি।
এখন যখন শিশুরা ক্যামেরার সামনেই অনাহারে মারা যাচ্ছে, তখন এই মিডিয়াগুলো নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করেছে- নৈতিক অবস্থান থেকে নয়, বরং নিজেদের রক্ষা করতে।
জনমত এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বলেছে, ইসরায়েল ‘গণহত্যা করছে’ বলে মনে করা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইউনিসেফ বলেছে, গাজা এখন বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা শিশুদের জন্য।
প্রমাণের পাহাড়ের মুখে পড়ে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নিজেদের ভূমিকা পাল্টে লেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা যেন তাদের তা না করতে দিই।
প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ-
আমাদের মনে রাখতে হবে কিভাবে ব্রিটিশ সম্পাদকরা ইসরায়েলি মুখপাত্রদের জায়গা দিয়েছিলেন, অথচ ফিলিস্তিনি চিকিৎসকদের কণ্ঠরোধ করেছিলেন; কিভাবে The Times ও The Telegraph এমন ভিত্তিহীন খবর ছেপেছিল যে হাসপাতালের নিচে সন্ত্রাসীদের সুড়ঙ্গ আছে- শিশু বিভাগগুলোকেও ‘সন্ত্রাসী ঘাঁটি’ হিসেবে চিত্রিত করেছিল; কিভাবে কিছু কলাম লেখক সন্দেহ প্রকাশ করেছিল- ফিলিস্তিনিরা আসলেই না-কি অনাহারে ভুগছে, না-কি সব সাজানো দৃশ্য!
আমাদের মনে রাখতে হবে, যখন গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা লাগাতার বোমাবর্ষণে ভেঙে পড়েছিল, তখন আমাদের নিজের চিকিৎসাবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় নিশ্চুপ ছিল- শিশুদের অনাহার নিয়ে কথা বলাটাকেও তারা ‘বিতর্কিত’ বলে এড়িয়ে গিয়েছিল এবং আমাদের এটাকে সঠিকভাবে বলতে হবে: এটি বর্ণবাদ।
শিশুদের কঙ্কালসার শরীর ও ফাঁপা পেট দেখে ব্রিটিশ সাংবাদিকদের যদি বুঝতে হয় যে ফিলিস্তিনিরাও মানুষ- তাহলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
শিশুদের অনাহারে মৃত্যু এখন শুধু ছবি হয়ে ধরা দিচ্ছে বলেই দুঃখজনক নয়, এটি দুঃখজনক কারণ এটি ছিল সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য এবং শুধুমাত্র তারা কে ছিল- এই কারণে এই মৃত্যুকে ‘যৌক্তিক’ ভাবা হয়েছিল।
এই দৃশ্য কি ঘটত, যদি তারা হতো ইসরায়েলি শিশু? ইউক্রেনীয় শিশু? ব্রিটিশ শিশু? অবশ্যই না। কিন্তু ফিলিস্তিনি শিশুদের জীবনকে ভোগ্যপণ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে- কখনো অদৃশ্য, কখনো রাক্ষস।
মাসের পর মাস ইসরায়েলি কর্মকর্তারা খোলাখুলিই বলেছেন- গাজাকে খাদ্য, জ্বালানি, পানি এবং ওষুধ থেকে বঞ্চিত করা হবে। প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট বলেছেন, তারা “মানব জন্তুদের” বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিকরা ‘দ্বিতীয় নাকবা’র আহ্বান জানিয়েছেন। তবুও, যুক্তরাজ্যের মিডিয়া এইসব না-শোনার ভান করেছে।
আমার গাজার সহকর্মীরা মার্চ ২০২৫-এ জানিয়েছিলেন- তাদের আর খাওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই। তারা অ্যানাস্থেশিয়া ছাড়া অস্ত্রোপচার করছেন, সন্তানদের ঘাস ফুটিয়ে খাওয়াচ্ছেন, শিশুরা পানিশূন্যতা ও অপুষ্টিতে মারা যাচ্ছে- এই দৃশ্য চোখের সামনে দেখছেন।
আমরা এই বিবরণ ব্রিটিশ সাংবাদিকদের, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে, চিকিৎসাবিষয়ক পেশাদার সংগঠনগুলোকে জানিয়েছি। কিন্তু বারবার তারা বলেছে—”সন্তুলন চাই“, “স্বাধীন যাচাই না হলে হবে না“, তারা একজন ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্রের বক্তব্য ছাপাবে কিন্তু একজন ফিলিস্তিনি শিশু চিকিৎসকের নয়- যিনি তিনটি শিশুর মৃত্যু নিজের চোখে দেখেছেন।
এটাই প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদের মুখ- উপনিবেশিতদের কাছে অসম্ভব প্রমাণ চাওয়া, কিন্তু দখলদারদের প্রতিটি কথা ‘সত্য’ বলে ধরে নেওয়া।
জবাবদিহির মুহূর্ত-
এই মুহূর্তে যে ছবি flooding করছে, তা কোনো মোড় নয়; এটি জবাবদিহির মুহূর্ত।
কারণ শুধু ইসরায়েলই এই শিশুদের অনাহারে মারছে না—যুক্তরাজ্য সরকারও তা করছে—যারা এখনো ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করছে, যুদ্ধাপরাধীদের আতিথ্য দিচ্ছে এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান রুখে দিচ্ছে।
গাজায় শিশুদের অনাহার কোনো বিচ্যুতি নয়; এটি একটি ব্যবস্থার ফল- একটি ব্যবস্থা, যেখানে কিছু জীবন শোকের যোগ্য আর কিছু জীবন মুছে ফেলার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত। এই ব্যবস্থাই দোষী- প্রত্যেক সম্পাদক, যারা ইসরায়েলি দখলদারত্বের মুখপাত্র হয়েছিলেন; প্রত্যেক চিকিৎসাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান, যারা নিরপেক্ষ ছিল যখন গাজার হাসপাতালগুলো ধ্বংস হচ্ছিল; প্রত্যেক ব্রিটিশ নেতা, যিনি এই যুদ্ধকে সমান শক্তির সংঘর্ষ বলে চালিয়েছেন।
গাজায় দুর্ভিক্ষ কোনো ব্যতিক্রম নয়; এটি একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থা- যা বেছে নেয় কোন জীবন মূল্যবান আর কোন জীবন অদৃশ্যযোগ্য এবং এই ব্যবস্থাকে এখন ভেঙে ফেলতে হবে, শুধু রূপ বদল নয়। তাই হ্যাঁ, ছবি দেখান। দেখান বিশ্বকে, কী হয়েছে। কিন্তু চোখ ফিরিয়ে নেবেন না সেই মানুষদের থেকে, সেই কাঠামোগুলোর থেকে যারা এই জিনিসগুলো সম্ভব করেছে।
দাবি করুন জবাবদিহি- শুধু ইসরায়েলের নয়, বরং ব্রিটেনের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকেও- যারা এই নৃশংসতা সম্ভব করেছে।
একজন শিশু চিকিৎসক হিসেবে আমি শপথ নিয়েছিলাম জীবন রক্ষা করার। তার মানে হলো- যখন শিশুদের অনাহারে মেরে ফেলা হচ্ছে, তখন তা বলার সাহস রাখা। যখন পুরো বিশ্ব চুপ আছে, তখন সেই নীরবতার পেছনে থাকা বর্ণবাদকে চিহ্নিত করা এবং তা মানে হলো— যারা এখন গাজার শিশুদের জন্য কান্না করছে, তারা যেন আর কখনো না পারে সিদ্ধান্ত নিতে- কে বাঁচবে, কে মরবে।
- লেখক: ডাঃ ওমর আবদেল-মান্নান লন্ডনে বসবাসকারী একজন ব্রিটিশ-মিশরীয় শিশু স্নায়ু বিশেষজ্ঞ। ২০১১ সাল থেকে তিনি গাজা এবং পশ্চিম তীরে অসংখ্য চিকিৎসা ও শিক্ষা প্রতিনিধিদলের সাথে অংশগ্রহণ করেছেন। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

