আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও দ্য হেগের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি আদালতের প্রেসিডেন্টসহ একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধ তদন্তের এখতিয়ারপ্রাপ্ত এই আদালতকে কার্যত অকার্যকর করে তোলার লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার সর্বশেষ ধাপ হিসেবেই এই পদক্ষেপকে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। উল্লেখ্য, বিশ্বের ১২০টির বেশি দেশ এই আদালতের সদস্য।
সংশ্লিষ্ট ঘোষণায় বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন আদালতের জাপানি প্রেসিডেন্ট এবং সেনেগালের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তারা এমন সব রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি করার প্রচেষ্টায় সম্পৃক্ত ছিলেন, যাদের সরকার এই আদালতের বিচারিক এখতিয়ারই স্বীকার করেনি। জবাবে আদালত জানিয়েছে, তারা তাদের কর্মীদের পাশে থাকবে এবং এ ধরনের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি নিজের এখতিয়ারের সীমা লঙ্ঘন করে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর এমন হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন। তবে প্রেসিডেন্ট বা হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো আসেনি।
পরিসংখ্যান বলছে, এ পর্যন্ত মোট ১১ জন কর্মকর্তা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছেন, যাদের মধ্যে নয়জন বিচারক এবং একজন প্রধান প্রসিকিউটর রয়েছেন। এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় সম্পদ জব্দ, ভ্রমণে বিধিনিষেধ এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা থেকে বঞ্চিত করার মতো ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে দুটি সংবেদনশীল প্রেক্ষাপট—একদিকে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা সদস্য ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালতের তদন্ত, অন্যদিকে গাজায় সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আদালতকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল—কোনো দেশই এই আদালতের সদস্য নয়। তবে ফিলিস্তিন ২০১৫ সালে সদস্যপদ লাভ করায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘটিত অভিযোগের তদন্তের সুযোগ আদালতের জন্য তৈরি হয়েছে।
এই আদালতের প্রতি বিরোধিতা নতুন কিছু নয়—এর আগের মেয়াদেও একে হুমকি আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আদালতের কোনো বৈধ এখতিয়ার নেই বলে মন্তব্য করা হয়েছিল। গত মাসে সদস্য দেশগুলোর প্রতি আদালত থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বানও জানানো হয়, যা মূলত প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করে দেওয়ার বৃহত্তর কৌশলের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। এ বিষয়ে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, কোন কোন দেশ এই আহ্বানে সাড়া দেয় তা আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক বিচারিক সংস্থার এখতিয়ার রয়েছে সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে সংঘটিত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার করার। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো বিষয় প্রেরণ করলে সদস্য না হওয়া দেশের ক্ষেত্রেও তদন্তের পথ খোলা থাকে।
সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে আদালত সতর্ক করে বলেছে, বিচারক ও কর্মীদের লক্ষ্য করে নেওয়া এ ধরনের পদক্ষেপ গোটা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে—তাদের ভাষ্যে, এসব পদক্ষেপ মূলত দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করার শামিল। একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার বিচার বিভাগীয় পরিচালক সম্প্রতি মন্তব্য করেন, প্রশাসন মূলত পছন্দের ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতার বাইরে রাখার সুযোগ তৈরি করতে চাইছে।
এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় যখন যুক্তরাষ্ট্রের চারটি শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, দাবি করে যে আদালতকে ভেঙে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নিউইয়র্কে দায়ের করা এই মামলায় সংগঠনগুলো জানায়, নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বজুড়ে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আদালতের সঙ্গে কাজ করা তাদের জন্য কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এর আগে জুন মাসে আদালতের তিনজন বিচারকও পৃথকভাবে ফেডারেল আদালতে মামলা করেন, যেখানে গত বছর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে আইনবহির্ভূত বলে চ্যালেঞ্জ করা হয়। তাদের অভিযোগ, এসব নিষেধাজ্ঞা মূলত বিচারিক স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি ও শাস্তিমূলক উদ্দেশ্যেই আরোপ করা হয়েছে। তখন হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা যুক্তি দেন, জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের অধীনে প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতা যথাযথভাবেই প্রয়োগ করেছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বাভাবিক আর্থিক কার্যক্রম চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে, কেননা মার্কিন ডলারে লেনদেনকারী বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যাংকগুলোকেও এসব বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়।
দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকে এই প্রশাসনের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জুলাই মাসে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, আদালত আন্তর্জাতিক আইনের নামে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একধরনের আইনি লড়াই চালাচ্ছে এবং দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক কাঠামোর জন্য হুমকি তৈরি করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো আঘাত এলে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
সামগ্রিক এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মধ্যকার এই সংঘাত সহজে প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। একদিকে আদালত তার প্রতিষ্ঠাগত এখতিয়ার রক্ষার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র একে নিজেদের সার্বভৌম স্বার্থের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। এই দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত পরিণতি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কাঠামো ও কার্যকারিতাকেই নতুনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারে।

