গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন ৫৮ জন সেনা। ইসরায়েলের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ বুধবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে অভিযানের সূত্রপাত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন হামাস যোদ্ধারা ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে অতর্কিত হামলা চালিয়ে প্রায় ১,২০০ মানুষকে হত্যা করে এবং আরও ২৫১ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) গাজায় পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করে, যা এখন পর্যন্ত চলছে।

হারেৎজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ আত্মহত্যা করেন ১৭ জন ইসরায়েলি সেনা। পরের বছর ২০২৪ সালে আরো ২৪ জন সেনা আত্মহত্যা করেন এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আরো ১৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। ফলে মোট আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮।
হারেৎজ জানায়, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিদ ও সমাজকর্মীর অভাব রয়েছে। বিষণ্নতা ও অবসাদগ্রস্ত সেনারা পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় মানসিক সংকট চরমে পৌঁছেছে। প্রতিমাসেই শত শত সেনা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিএসটিডি)-এ আক্রান্ত হয়ে সেনাবাহিনীর পুনর্বাসন শাখায় ভর্তি হচ্ছেন।
আত্মহত্যার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে চলতি সপ্তাহেই। সোমবার দক্ষিণ ইসরায়েলের ওফাকিম শহরের একটি বাড়ি থেকে এক সেনার মরদেহ উদ্ধার করে কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসা পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি বাহিনী নানা জটিলতা ও প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে অভিযান পরিচালনা করছে। মানসিক চাপে থাকা সেনাদের মধ্যে হতাশা, ক্লান্তি ও যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক ট্রমা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। হারেৎজের প্রতিবেদন মতে, যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, সহযোদ্ধাদের মৃত্যু এবং অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে সেনাদের মানসিক অবসাদ প্রবলভাবে বেড়েছে।
গাজা যুদ্ধে অংশগ্রহণের দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি এবং সহকর্মীদের মৃত্যুর শোকের কারণে ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে গভীর মানসিক কষ্ট দেখা দিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো বহু সেনার মনে ট্রমা সৃষ্টি করেছে, যা তাদের মানসিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করেছে।
পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সেবার ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে তারা একাকিত্ব ও হতাশার শিকার হচ্ছেন, যা অনেককেই আত্মহত্যার পথ নিতে বাধ্য করেছে। এই মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে সামলাতে না পারাই ইসরায়েলি সেনাদের আত্মহত্যার পিছনের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গাজা অভিযানে এ পর্যন্ত ৮৯৪ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরো ৬,১৩৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আইডিএফ। পাল্টা হামলায় গাজা উপত্যকায় নিহত হয়েছেন ৬০ হাজার ১৩৮ জন ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে ৫৬ শতাংশই নারী, শিশু ও বেসামরিক নাগরিক।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ কেবল জীবনহানিই ঘটায় না, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া বহু সেনার জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক আত্মহত্যার প্রবণতা সেই বাস্তবতার একটি উদ্বেগজনক প্রতিফলন।

