ইউক্রেন যুদ্ধের পর রুশ তেলের বৃহৎ ক্রেতা হিসেবে ভারতের উত্থান, ট্রাম্পের বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়া এবং বিশ্ব রাজনীতিতে জ্বালানি বাণিজ্যের পরিবর্তিত সমীকরণ বিশ্লেষণে যা উঠে এসেছে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন—
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কেনার দায়ে ভারতকে প্রকাশ্যে অভিযুক্ত করেছেন এবং এর জেরে দেশটির ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “ভারত রাশিয়ার সঙ্গে কী করছে, আমি তার পরোয়া করি না। তারা চাইলে একত্রে নিজেদের মৃত অর্থনীতি নিচে নামিয়ে নিতে পারে, আমার কিছু আসে যায় না।” এই মন্তব্য বিশ্ব কূটনীতিতে আলোড়ন তোলে, কারণ এর আগে কখনো ট্রাম্প রাশিয়া-ভারত জ্বালানি সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেননি।
রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নেয় ভারত-
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে রাশিয়ার ইউরোপীয় তেলবাজার কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিকে ভারত মূল্যছাড়ে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। যুদ্ধের আগে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ।
অথচ ২০২৩ সালের মে মাস নাগাদ রাশিয়া থেকে ভারতের দৈনিক তেল আমদানি ২০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছে। এটি ভারতের মোট আমদানির প্রায় ৪৫ শতাংশ; চীনের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
এই বিপুল রপ্তানি রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য বাঁচনস্বরূপ হলেও, ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রুপি রক্ষা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় ভারত এই আমদানিকে কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছে।

পশ্চিমা জোটের মূল্যসীমা অগ্রাহ্য করে রুশ তেল কেনে ভারত-
রাশিয়ার ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত ৬০ ডলার ব্যারেল দরের সীমা থাকলেও ভারতীয় কোম্পানিগুলো প্রায়ই এই সীমার বেশি দামে তেল কিনেছে। বিশেষ করে ভারতের বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এই তেল পরিশোধন করে তার একাংশ নিজেদের ব্যবহার করেছে এবং বাকিটা রপ্তানি করেছে। কিছু পণ্য আবার ইউরোপেও পৌঁছেছে বলে তথ্য উঠে এসেছে।
রিলায়েন্সের মুনাফা ও শেয়ারদরেও এর ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যায়- ইউক্রেন যুদ্ধের পর কোম্পানিটির শেয়ারদর ৩৪ শতাংশ বেড়েছে।
ট্রাম্পের অভিযোগে জটিলতায় মোদি সরকার-

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য ট্রাম্পের এই হঠাৎ আক্রমণ রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। মোদি প্রশাসন ধারণা করেছিল, রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে ট্রাম্প নমনীয় থাকবেন এবং ভারত যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়ায়, তবে দুই দেশের প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। কিন্তু ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য মোদির কূটনৈতিক পরিকল্পনাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
ভারতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও মোদির ট্রাম্পবিরোধী অবস্থান না নেওয়াকে কেন্দ্র করে কড়া সমালোচনায় মুখর হয়েছে। গত জুন থেকেই ট্রাম্প মোদিকে হেয় করে মন্তব্য করে চলেছেন এবং ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেছেন।
ভারত রাশিয়ার সঙ্গে কী করছে, আমি তার পরোয়া করি না। তারা চাইলে একত্রে নিজেদের মৃত অর্থনীতি নিচে নামিয়ে নিতে পারে, আমার কিছু আসে যায় না।
-ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন প্রেসিডেন্ট
শাস্তিমূলক শুল্ক ভারতের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে?
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ট্রাম্প প্রশাসন ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে, তবে তা ভারতের রপ্তানি খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যদিও ভারত বিশ্বের দ্রুততম বিকাশমান অর্থনীতির অন্যতম, তথাপি শুল্ক বাড়লে দেশটির কারখানাভিত্তিক রপ্তানি, বিশেষত টেক্সটাইল ও প্রযুক্তিপণ্য খাতে ব্যাপক চাপ পড়বে।
ভারতের কর্মকর্তারা জানান, গত চার মাস ধরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক ও আলোচনা চললেও কখনো রাশিয়ার তেল কেনার বিষয়টি ওঠেনি। তাই এই হঠাৎ হুমকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই অনেকের ধারণা।

বিশ্লেষকের পর্যবেক্ষণ: কৌশলগত দরকষাকষি না কি তেলের রাজনীতি?
নয়াদিল্লিভিত্তিক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন, ট্রাম্পের মন্তব্য একটি কৌশলগত চাপের অংশ। তিনি বলেন, “ছাড়ে পাওয়া রাশিয়ার তেল বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় ভারতের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ভারত একতরফা কোনো চুক্তিতে পা দেয়নি, এটিই বড় অর্জন।”
তিনি এটিকে ট্রাম্পের পুরনো কৌশল বলেই মনে করেন- প্রথমে হুমকি, পরে দরকষাকষি। শ্রীবাস্তবের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বহুপাক্ষিক সম্পর্ককে একতরফাভাবে চালানো সম্ভব নয়, বিশেষ করে যখন জ্বালানি, অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতির স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ট্রাম্পের বার্তা: পাকিস্তান হয়ে উঠবে নতুন অংশীদার?
এতদিন পর্যন্ত ভারতকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা গেলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি জানান, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তিতে উপনীত হয়েছে- যার আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলো পাকিস্তানের তেল রিজার্ভ ব্যবহার করতে পারবে। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, “হয়তো একদিন তারা ভারতে তেল বিক্রি করবে!” এই বার্তা ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতিতে এক ধরনের চাপে পরিণত হতে পারে।
পরিশেষে, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা অবরোধ বিশ্ব রাজনীতিতে জ্বালানিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। ভারত এই পরিস্থিতিতে বাস্তববাদী কৌশল গ্রহণ করেছে- কম দামে জ্বালানি আমদানি করে নিজের অর্থনীতিকে রক্ষা করেছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত অবস্থান, হঠাৎ শুল্ক হুমকি এবং রাজনৈতিক আক্রমণ ভারতের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য কৌশলে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বমঞ্চে এখন বড় প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে রাশিয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না। আর তেলের ভূ-রাজনীতি কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি করবে, সেটিই এখন লক্ষণীয়।

