দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। নতুন জোট গঠনের পাশাপাশি পুরনো সম্পর্কেও ফাটল ধরছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এক কৌশলগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট যেমন RCEP-এ যোগ দিলে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে, তবে ঝুঁকিও কম নয়।
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল—চীনের প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র থাকবে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখবে। কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি রাশিয়া থেকে তেল আমদানির পক্ষে বিবৃতি দেয়। এর জবাবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যে ৫০% শুল্ক আরোপ করেন। এতে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
এছাড়া ট্রাম্প তার দক্ষিণ এশিয়া নীতি বদলাচ্ছেন। চীনের ঘনিষ্ঠ দেশ মিয়ানমারের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র এখন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। ফলে, ভারত ও চীনের মধ্যে নতুন সখ্যতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ওবায়দুল হক বলেন, “আগে মনে করা হতো, চীনের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র বন্ধু ভারত। কিন্তু ট্রাম্পের হিসাব আলাদা। পরিস্থিতি এখনো স্থায়ী আকার নেয়নি। তাই বাংলাদেশকে বসে না থেকে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সব দিক বিবেচনায় প্রস্তুতি নিতে হবে।”
গবেষণা প্রতিষ্ঠান RAPID-এর চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে RCEP-এ যোগ দিলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও রপ্তানি দুইই বাড়তে পারে। বর্তমানে ১৫টি দেশ নিয়ে গঠিত এই জোটের বাজারমূল্য ২৬.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশ সদস্য হলে রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে, ৩.৩৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক বিনিয়োগ আসতে পারে এবং জিডিপি ০.২৬% বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে ঝুঁকিও আছে। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “RCEP-এ যোগ দিলে আমাদেরও বাজার উন্মুক্ত করতে হবে। বর্তমানে সরকারের প্রায় ২৭% রাজস্ব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুল্ক থেকে আসে। শুল্ক কাঠামো পরিবর্তনে আমরা প্রস্তুত কি না, সেটি বড় প্রশ্ন।”
ওবায়দুল হক বলেন, “RCEP বা BRICS-এ যোগ দেওয়া সহজ নয়। সদস্য হতে হলে বিস্তৃত গবেষণা, ঝুঁকি-সুযোগ মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিতে হবে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, সদস্য হতে হলে ১৫টি দেশের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে আলোচনা করতে হবে, যা দুই থেকে তিন বছর সময় নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দক্ষিণ এশিয়ার নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক জোটে যুক্ত হওয়ার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সময়মতো প্রস্তুতি নিলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক অবস্থান—সব ক্ষেত্রেই লাভবান হওয়া সম্ভব।

