ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবারো গাজা উপত্যকায় একটি নতুন সামরিক অভিযান চালু করেছেন। এই অভিযান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র সমালোচনা এবং গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদেশের আপত্তি সত্ত্বেও শুরু হয়েছে। নেতানিয়াহু এটিকে ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র যুদ্ধের সমাপ্তির “দ্রুততম উপায়” হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তবে এই অভিযান বাস্তবায়নে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) প্রধানভাবে রিজার্ভ সেনাদের ওপর নির্ভর করছে, যা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গাজার উপত্যকায় আইডিএফ ইতোমধ্যেই ৮০ শতাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। কিন্তু অবশিষ্ট অংশের মধ্যে গাজা সিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল গাজার বৃহত্তম শহর নয়, বরং হামাসের ‘চূড়ান্ত আস্তানা’ হিসেবেও পরিচিত। নেতানিয়াহু নিজে এই শহরকে হামাসের অবশিষ্ট ক্ষমতা কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং গাজা দখলের মূল লক্ষ্য হিসেবে স্থাপন করেছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে—বরাবর সমীহ জাগানো আইডিএফ কি এখনো তাদের পুরোনো শক্তি ধরে রাখতে সক্ষম?

রিজার্ভ সেনাদের ওপর নির্ভরতা-
গাজা সিটি দখলের জন্য আইডিএফ প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার রিজার্ভ সেনাকে নিয়োগে নেয় এবং পরবর্তীতে আরও ৬০ হাজারকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়। আইডিএফ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন জানিয়েছেন, ইতোমধ্যেই সেনারা গাজা সিটির উপকণ্ঠে অবস্থান নিয়েছে। এটি গাজা দখলের বৃহত্তর সামরিক অভিযানের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজা দখলের পরিকল্পনা অনুমোদনের পর হিসাব করা হয়, এই অভিযান সম্পন্ন করতে অন্তত পাঁচ মাস সময় এবং পাঁচটি ডিভিশন সেনা প্রয়োজন। কিন্তু নেতানিয়াহু এই সময়সীমা কমানোর নির্দেশ দেন, যা সেনাদের উপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
আইডিএফের সক্রিয় সেনার সংখ্যা সীমিত। যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে রিজার্ভ সেনাদের তৎপর করা হয়। এই সেনারা মূলত অস্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত, এবং ছুটির পর তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। দীর্ঘ দুই বছরের যুদ্ধ ও আগ্রাসনের ফলে এই সেনারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত। অনেকেই শারীরিক আহত এবং মানসিক চাপের কারণে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছে।

দুই বছরের অবিরাম যুদ্ধ ও মানসিক অবসাদ-
আইডিএফের চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির চলতি মাসের শুরুতে নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার কাছে সতর্ক করেন, সেনারা দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধের চাপের কারণে মানসিক অবসাদে ভুগছেন। তিনি নতুন অভিযানের ঘোরতর বিরোধিতা করেন এবং সতর্ক করেন যে, বাকি বন্দিদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়বে। নেতানিয়াহু ও তার মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা এসব সতর্কতা উপেক্ষা করেছেন।
হিব্রু ইউনিভার্সিটির আওতাধীন আগাম ল্যাবসের একটি জরিপে দেখা গেছে, সেনাদের মধ্যে ৪০ শতাংশ লড়াই চালানোর উৎসাহ হারিয়েছে। মাত্র ১৩ শতাংশ সেনা এখনও যুদ্ধ চালানোর মনোবল রেখেছেন। বাকি সেনারা মনে করছেন, এই যুদ্ধের কারণে কেবল তাদের জীবন নয়, সাধারণ নাগরিকদের জীবনও বিপন্ন হচ্ছে। জরিপে সেনাদের মানসিক দুর্বলতা, ক্লান্তি এবং উদ্বেগের চিত্র স্পষ্ট।
ধর্মীয় রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক-
ইসরায়েলি সামরিক কর্তারা সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন, ধর্মীয় রক্ষণশীল সম্প্রদায়কে সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিধান চালু করতে। তবে এই সম্প্রদায়ের অনেকেই যোগ দিতে অস্বীকার করেছেন। ইতিহাসে, ধর্মীয় রক্ষণশীলদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনায় নেয়া হয়নি। গাজার যুদ্ধে অংশগ্রহণের পর এই বিষয়টি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রক্ষণশীলরা অভিযোগ করেছেন, সরকার এই বিষয়টি নিয়ে অযথা চাপ সৃষ্টি করছে।

রিজার্ভ সেনাদের অনিচ্ছা ও সংগঠন-
‘সোলজার্স ফর হোস্টেজেস’ নামে একটি রিজার্ভ সেনাদের সংগঠন আইডিএফের আহ্বান উপেক্ষা করতে আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছে, “আইডিএফের অন্যায় আহ্বানে সাড়া দেবেন না।” বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ছুটি শেষে ডাক পেলেও অনেক রিজার্ভ সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসবে না।
টিআরটি গ্লোবালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় এক লাখ রিজার্ভ সেনা ছুটি শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরেননি। উদাহরণ হিসেবে আভশালম জোহার সাল উল্লেখ করা যায়, তিনি গত দুই বছরে চারবার গাজার যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন এবং সর্বমোট ৩০০ দিন যুদ্ধক্ষেত্রে কাটিয়েছেন। সর্বশেষ ছুটি শেষে তিনি আর গাজায় যেতে আগ্রহী নন।
জোহার বলেন, “আমি বিস্মিত, কারণ আমরা এমন এক যুদ্ধ নিয়ে কথা বলছি, যা বহু আগে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।” তিনি দ্বিধায় আছেন এবং মনে করেন, এই যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য প্রায় ভুলে যাওয়া হয়েছে। জোহার অভিযোগ করেছেন, সরকার এখন শুধুমাত্র হামাসকে ধ্বংস করতে চায়, যেকোনো মূল্যেই।
সেনাদের নিরাপত্তা ও ঝুঁকি-
আইডিএফ মুখপাত্র ডেফরিন নিশ্চিত করেছেন, গাজার বন্দিদের জীবন রক্ষার জন্য গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য সক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তিনি সেনাদের সুরক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি। যদি কোনো রিজার্ভ সেনা নির্দেশ অমান্য করে, আইডিএফ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু চলতি অভিযানে এ ধরনের শাস্তি প্রয়োগের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই।

সাবেক চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ড্যান হালুৎজ মনে করেন, রিজার্ভ সেনারা সবাই যুদ্ধে যোগ দেবে না। তিনি উল্লেখ করেছেন, অনেকেই বাড়িতেই থাকবেন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কোনো যুক্তি নেই। তিনি সেনাদের বলছেন, “নিজেদের বিবেক অনুযায়ী কাজ করুন। নিজের নীতির প্রতি অটল থাকুন।”
নেতানিয়াহুর পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা-
নেতানিয়াহু এক বছর আগে বলেছিলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দক্ষিণ গাজার রাফায় অভিযান শেষে যুদ্ধ শেষ হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, “কয়েক মাস নয়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র পর্যায় শেষ হবে।”
কিন্তু ১৮ মাস পরে তিনি বলছেন, গাজা দখল করলেই যুদ্ধ দ্রুত সমাপ্ত হবে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আইডিএফের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সতর্ক করছেন, গাজা সিটি দখল করা অযৌক্তিক। এতে ইসরায়েলের বন্দি এবং অসংখ্য ফিলিস্তিনি জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে।

গত ২২ মাসে গাজার ২০ লাখ মানুষ মানবিক সঙ্কটে ভুগছে। ইসরায়েলের হামলায় ৬২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। শিশু ও নারীও আক্রান্ত হয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল এবং পানীয় জলের সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত। জাতিসংঘের মতে, গাজার ৮০ শতাংশ বাসিন্দা এখন মানবিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল।
মানবিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা-
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই হুমকি জানিয়েছে, গাজা সিটির ওপর ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অসংখ্য সিভিলিয়ান প্রাণের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। ২০ লাখ মানুষের এই উপত্যকায় বিদ্যুৎ, পানি, চিকিৎসা ও খাদ্য নিরাপত্তার সংকট তীব্র। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গাজার অধিকাংশ পরিবার খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারছে না।
আইডিএফের সামরিক পরিকল্পনায় অনিচ্ছুক এবং ক্লান্ত রিজার্ভ সেনাদের ব্যবহার মানবিক ঝুঁকি আরো বাড়াচ্ছে। এতে শুধুমাত্র সেনাদের জীবন নয়, গাজার সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তাও গুরুতর হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে মানবিক বিপর্যয় আরো গভীর হবে এবং আন্তর্জাতিক চাপ বেড়ে যাবে।

