অরুণাচল প্রদেশে ব্রহ্মপুত্রের ওপর বিশাল বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে ভারত সরকার। বর্তমানে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। উজানে চীনের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পাল্টা হিসেবেই নয়াদিল্লির এই উদ্যোগ।
ঢাকার পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, চীন যদি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাঁধ নির্মাণ করে, তাহলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না, বরং উপকার হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পানি সরিয়ে নেওয়া হলে বিপদ ঘটতে পারে। এজন্য বাংলাদেশ ও ভারতের উচিত চীনের সঙ্গে যৌথভাবে সমন্বয় করে নিম্ন অববাহিকায় পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা।

চীনের বাঁধ বনাম ভারতের পাল্টা প্রকল্প-
স্ট্রেটস টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, চীন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ৬০ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মেদোগ হাইড্রোপাওয়ার স্টেশন নির্মাণের অনুমোদন দেয়, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। চলতি বছরের জুলাইয়ে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এটি বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর জবাবে ভারত ঘোষণা দিয়েছে ১১.২ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ‘আপার সিয়াং মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’, যার ব্যয় হবে প্রায় এক হাজার ৩২০ কোটি ডলার।
চীনা বাঁধের কারণে শুকনো মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রের ভারতীয় অংশে পানির প্রবাহ ৮৫% পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে নয়াদিল্লি। তারা মনে করছে, বেইজিং পানিকে অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। ভারতের ধারণা, তিব্বতে বাঁধ নির্মাণ করে চীন নদীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা বার্ষিক চার হাজার কোটি কিউবিক মিটার পানি সরিয়ে নিতে সক্ষম হবে। এতে কোটি মানুষের কৃষি, শিল্প ও জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য জানিয়েছে, প্রকল্পের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা হয়েছে এবং ভাটির দেশগুলোর জলসম্পদ বা পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না।
ভারতের অভ্যন্তরে বিতর্ক-
অরুণাচল প্রদেশে ভারতের ‘আপার সিয়াং’ প্রকল্প স্থানীয় আদিবাসীদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই বাঁধ নির্মাণ হলে ২৭টি গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যাবে, কয়েক হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারাবে এবং প্রায় এক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সম্প্রতি সিয়াং ইন্ডিজিনাস ফার্মার্স ফোরামের আহ্বানে গেকু এলাকায় কয়েক হাজার মানুষ সমবেত হয়ে প্রকল্প বাতিলের দাবি জানায়। তারা সিয়াং নদীকে ‘পবিত্র’ হিসেবে ঘোষণা করে বলেন, এই নদী তাদের কাছে ‘মা’।

ভূমিকম্প ও পরিবেশগত ঝুঁকি-
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, হিমালয়ের এ অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ। বড় কোনো ভূমিকম্পে বাঁধ ভেঙে গেলে ভারত, চীন ও বাংলাদেশ ভয়াবহ বন্যার মুখে পড়তে পারে। ১৯৫০ সালে আসাম-তিব্বত অঞ্চলে ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৪,৮০০ মানুষ মারা গিয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সিয়াং উপত্যকায় সমীক্ষায় দেড় হাজারের বেশি নতুন উদ্ভিদ, পোকামাকড়, পাখি ও বন্যপ্রাণী শনাক্ত করা হয়েছে। বাঁধ নির্মাণ হলে এসব প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।

বাংলাদেশের অবস্থান-
অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই, কারণ চীন নিয়মিত তথ্য বাংলাদেশকে জানাচ্ছে। সম্প্রতি চীনা রাষ্ট্রদূত ঢাকায় বৈঠক করে আশ্বস্ত করেছেন যে, বাঁধটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যই ব্যবহৃত হবে।

