ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র বিমান ও স্থলহামলার মধ্যে পড়ে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় নগরী গাজা সিটি ত্যাগ করছেন হাজারো নাগরিক। বোমাবর্ষণ ও ট্যাংক-অগ্রযাত্রার ঝুঁকি অনুযায়ী সবাই যে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে পারছেন না—এটাই পরিস্থিতির ভয়াবহতা। জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন এই যুদ্ধকে গণহত্যার সম্ভাব্যতা থাকা হিসেবে মূল্যায়ন করেছে এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনা তীব্র হচ্ছে। আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
এক ভয়াবহ তাণ্ডবের ছবি-
গাজা সিটি শহরজুড়ে মানুষের কাছ থেকে কেবল সামান্য ভোগ্যপণ্য ও আসবাবপত্র নিয়ে পালানোর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে—ভ্যান, লোহার ট্রলি বা এমনকি গাধার গাড়িতেও মানুষজন শহর ছেড়ে দক্ষিণ দিকের দিকে ছুটছেন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শন ইসরায়েল কাটজ এক্সে লিখেছেন, “গাজা জ্বলছে।”
সংবাদে বলা হয়েছে, মাত্র এক দিনের মধ্যে ইসরায়েলি অভিযানেই এ অঞ্চলে শতাধিককে ছাড়িয়ে—একদিনের মধ্যে আইনী সূত্রে প্রতিবেদন অনুযায়ী কমপক্ষে ৯১ জন নিহত হয়েছেন। এই হামলায় নানান আবাসিক ভবন ধ্বংস হয়েছে; মঙ্গলবারই প্রায় ১৭টি আবাসিক ভবন ধ্বংসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মানুষ চলেছেন—কিন্তু নিরাপত্তা নেই-
গাজার স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি গণমাধ্যমের ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যাগত বিবরণ রয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক দাবি করেছে, প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ শহর ছাড়েছে। অন্যদিকে গাজার সরকারি গণমাধ্যম জানিয়েছে, একই সংখ্যক মানুষ শহরের কেন্দ্রীয় ও পশ্চিম অংশে আশ্রয় নিয়েছেন, আর প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সম্পূর্ণভাবে গাজা সিটি ছেড়ে গেছে। বাস্তবে কতজন রয়ে গেছেন- এটি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
দক্ষিণে পালিয়েছে বলে যাঁরা ভেবে গেছেন, তাদেরও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই—রাফাহ, খান ইউনিস ও অল-মাওয়াসির আশ্রয়শিবিরগুলোতে দুর্ভিক্ষজনিত সংকট, অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আল-মাওয়াসি ক্যাম্পে মানুষ ঠাঁস ঠাঁস করে আসায় সেখানেও বোমাবর্ষণের শিকার হওয়ার খবর পাওয়া গেছে; এমন পরিস্থিতি দেখে কয়েক হাজার মানুষ শহরে ফিরে এসেছে।
যুদ্ধে নতুন ধাঁচের কৌশল: রোবট ও বিস্ফোরক ডিভাইস-
আল জাজিরা উল্লেখ করে, ইসরায়েলি সেনারা বিস্ফোরক বোঝাই রোবট মোতায়েন করছে- সংস্থাটির পূর্বের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ১৫টি রোবট ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এগুলো দিয়ে একাধিক বাড়ি ধ্বংশ করা সম্ভব। একই সঙ্গে আকাশপথে ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও অগ্রসরমান পদতল বাহিনীর ছবি প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী; তারা জানিয়েছে গাজা সিটির নিয়ন্ত্রণ নিতে “কয়েক মাস” সময় লাগতে পারে। সেনাবাহিনী গাজায় অভিযান অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মানবিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া-
জাতিসংঘ মহাসচিব এ হামলাকে “ভয়ঙ্কর” আখ্যা দিয়েছেন- জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনও ঘটনার ন্যায়বিচারের ও মানবতাবিদ্বেষী দৃষ্টিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের টুকটাক নিন্দা থেকে এখন তা আরও তীব্র পর্যায়ে পৌঁছেছে—মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, নিরাপদ পথের নিশ্চিতকরণ ও নিরহঙ্গ লোকজনের সুরক্ষা এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।
অবস্থা উদ্ভাবনশীল—কী থাকবে পরবর্তী?
গাজায় যুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি স্থল অভিযান ও নগর নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা ইঙ্গিত করলে বিশাল সংখ্যক শরণার্থীর তীব্র মানবিক সংকট সৃষ্টি হবে- খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের চাহিদা কয়েক গুন বেড়ে যাবে। হামলার তীব্রতা ও গতি ধরে রাখা হলে বহুতল আবাসিক ও নোংরা ধ্বংসের কারণে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজন পড়বে।

