গাজার আকাশে একের পর এক বোমা বর্ষণ করছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। ঠিক সেই সময় ফোন আসে গাজার প্রধান প্রত্নতত্ত্ববিদ ফাদেল আল-ওটলের কাছে। খবরটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর আশঙ্কার সত্যি রূপ—ইসরায়েলি সেনারা জানিয়ে দিয়েছে, তারা হামলা চালাতে যাচ্ছে সেই সুউচ্চ ভবনে, যেখানে সযত্নে সংরক্ষিত আছে হাজার বছরের পুরোনো প্রত্নসম্পদ।
সুইজারল্যান্ডে নির্বাসিত ফাদেল বললেন, “দু’দিন ঘুমাতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, যেন আমার হৃদয়েই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানবে।”
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের চাপে ইসরায়েল একদিন সময় দেয় উদ্ধারকাজের জন্য। সেই সীমিত সময়ের মধ্যে ফাদেল দূর থেকে সমন্বয় করেন, আর গাজার কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী ও ত্রাণকর্মী ছয় ট্রাকভর্তি প্রত্নবস্তু সরিয়ে নিতে সক্ষম হন। প্রাচীন মৃৎশিল্প, রঙিন মোজাইক, এমনকি শতাব্দীপ্রাচীন মানুষের কঙ্কালও পৌঁছে যায় নিরাপদ জায়গায়।
কিন্তু সবকিছু রক্ষা সম্ভব হয়নি। ১৩ তলা আল-কাওসার ভবনে রকেট আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিরতরে হারিয়ে যায় অমূল্য ইতিহাস।
পাঁচ হাজার বছরের উত্তরাধিকার
গাজার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। মিশর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া—প্রাচীন সভ্যতার এক মিলনস্থল ছিল এ ভূমি। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট থেকে নেপোলিয়ন—গাজার পথ ধরে গেছেন প্রায় সবাই। ক্যানানীয়, মিশরীয়, ফিলিস্তিনি, আসিরীয়, গ্রিক, রোমান, বাইজেন্টাইন, মমলুক, অটোমান—অসংখ্য সভ্যতার চিহ্ন আজও বালির নিচে লুকিয়ে আছে।
ফাদেল আল-ওটল বেড়ে উঠেছেন গাজার শাতি শরণার্থী শিবিরে। শৈশবে সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে আসা ভগ্ন মৃৎপাত্রই তাকে মুগ্ধ করেছিল। পরে ফ্রান্সে প্রত্নতত্ত্বে পড়াশোনা শেষে তিনি ফিরে আসেন গাজায়। তার নেতৃত্বে খননকাজে বেরিয়ে আসে সেন্ট হিলারিওন মঠ, যা গত বছর ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
কিন্তু এখন যুদ্ধ তার সারাজীবনের কাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তিনি বললেন, “কখনো ভাবিনি প্রত্নসম্পদ, জাদুঘর, প্রাচীন স্থাপনা এভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।”

ধ্বংসস্তূপে গাজার প্রতীক
ইউনেস্কোর হিসাবে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১১০টি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
-
৭০০ বছরের পুরোনো কাসর আল-বাশা জাদুঘর ধ্বংস হয়ে গেছে।
-
ওমারি মসজিদের অষ্টভুজ মিনার ভেঙে এখন কেবল ভগ্নস্তূপ।
-
সোনার বাজারের প্রবেশদ্বার গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
-
হাম্মাম আল-সামরা—গাজার শেষ ঐতিহাসিক গণস্নানাগার—এখন ধ্বংসস্তূপ।
-
আরদ আল-মোহারবিনের রোমান যুগের কবরস্থান বুলডোজার চালিয়ে নিশ্চিহ্ন।
-
জাবালিয়ার বাইজেন্টাইন গির্জা, যেখানে ছিল দুর্লভ মোজাইক, এখন খোলা ধ্বংসাবশেষ।
ফাদেল বলেন, “মানুষ খাবার-পানির খোঁজে দিন কাটাচ্ছে। তবুও প্রতিদিন কেউ না কেউ আমাকে ফোন করে তাদের বেদনা জানায়—কারণ এই প্রাচীন নিদর্শনের সাথে তাদের আত্মিক সম্পর্ক।”

নতুন প্রজন্মের প্রত্নযোদ্ধা
ফাদেলের পাশাপাশি আরেকজন যোদ্ধা হলেন জেহাদ আবু হাসান, একজন ফরাসি-ফিলিস্তিনি। তিনি গাজায় চালু করেছিলেন ইন্তিকাল প্রোগ্রাম, যেখানে তরুণদের প্রত্নতত্ত্ব ও পর্যটনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। যুদ্ধ শুরুর পর সেই তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরাই জীবন বাজি রেখে নিদর্শন রক্ষায় নেমেছে।
জেহাদ বলেন, “মানুষের অগ্রাধিকার এখন বেঁচে থাকা। তবুও আমি বিশ্বাস করি, যুদ্ধ শেষে গাজার সংস্কৃতি ও ইতিহাসই আমাদের পুনর্গঠনের মূল ভিত্তি হবে।”
ইসরায়েল বলছে, হামাস বেসামরিক এলাকায় সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলে, এজন্য ঐতিহাসিক স্থানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা দাবি করে, প্রতিটি অভিযানের আগে আন্তর্জাতিক আইন মেনে সতর্ক করা হয়।
কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ করেছে—ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনিদের সংস্কৃতি ও ইতিহাস মুছে দিচ্ছে। এই অভিযোগ এখন গণহত্যার মামলার অংশ হিসেবে শুনানি চলছে।
বিদেশে বেঁচে থাকা উত্তরাধিকার
বিদেশে কিছু গাজা-সম্পদ অক্ষত আছে। প্যারিসের Institut du Monde Arabe-এ প্রদর্শিত হচ্ছে শত শত প্রত্নবস্তু—মৃৎশিল্প, ভাস্কর্য, কলস, এমনকি গ্রীক দেবী আফ্রোদিতির এক বিরল ভাস্কর্য।
এই সংগ্রহের বড় অংশ সংগ্রহ করেছিলেন গাজার ধনী ব্যবসায়ী জাওদাত খুদারি। তিনি বলেন, “কারখানা ধ্বংস হলে আমি আবার বানাতে পারব। কিন্তু গাজার মুদ্রা, রোমান যুগের কলস—এসব আর কোথায় পাব? ইতিহাস একবার ভেঙে গেলে ফেরানো যায় না।”
আজ প্যারিসে লম্বা লাইন পড়ে গাজার প্রদর্শনী দেখতে। দর্শনার্থীরা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন হাজার বছরের ঐতিহ্যের দিকে। আর সুইজারল্যান্ডে বসে ফাদেল আল-ওটল তালিকা করছেন সেই নিদর্শনের, যেগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে।
তিনি বলেন, “মনে কষ্ট হয়, নস্টালজিয়ায় ভুগি। তবুও মনে করি, আল্লাহর রহমত যে অন্তত এই অংশটুকু ধ্বংস হয়নি।”

