সুদানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামরিক সহিংসতায় আরএসএফ (র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস) প্রধান মোহামেদ হামদান দাগালো, যিনি হেমেদতি নামেও পরিচিত, একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছেন। হেমেদতি আধা সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে সুদানের অর্ধেক অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং দেশের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছেন। জাতিসংঘের ভবনে হামলার মতো ঘটনায়, যেখানে ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন, আরএসএফকে দায়ী করা হয়েছে।
প্রারম্ভিক জীবন ও উত্থান-
হেমেদতির জন্ম ১৯৭৪ বা ১৯৭৫ সালে সুদানের একটি সাধারণ পরিবারের সদস্য হিসেবে। তার পরিবার মহারিয়া শাখার রিজেইগাত সম্প্রদায়ের, যারা ঐতিহ্যগতভাবে উট পালন করে জীবিকা নির্বাহ করত। পরিবারটি দারফুরে চলে আসে, যেখানে তারা স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে বসবাস শুরু করে। কৈশোরেই হেমেদতি পড়াশোনা ছেড়ে উট বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হন।
দারফুর তখন সুদানের সরকারের অবহেলায় একটি দুর্বল ও আইনহীন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই সময় জানজাবিদ নামে আরব মিলিশিয়ারা স্থানীয় ফুর সংখ্যালঘু গ্রামগুলোতে আক্রমণ চালায়। হেমেদতি এই মিলিশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গ্রামে লুটপাট, আগুন লাগানো ও হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন।

২০০৪ সালে আদওয়া গ্রামে জানজাবিদের হামলায় অন্তত ১২৬ জন নিহত হন। এই সময় হেমেদতি তুলনামূলকভাবে কমান্ডার অবস্থানে থাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তের আওতায় আসেননি। তবে এই ঘটনা তাকে সামরিক দক্ষতা ও কৌশলগত নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
আধা সামরিক বাহিনী ও আরএসএফের উত্থান-
পরবর্তী বছরগুলোতে হেমেদতি নিজেকে সুদানের সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি যোদ্ধাদের বকেয়া বেতন, পদোন্নতি এবং নিজের পরিবারের জন্য পদ দাবি করে বশির সরকারের সঙ্গে সাময়িকভাবে বিদ্রোহ চালান। পরে সরকার প্রায় সব দাবি মেনে নেয় এবং হেমেদতি আবার মূল বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হন।
২০১৩ সালে হেমেদতি আনুষ্ঠানিকভাবে আরএসএফের প্রধান নিযুক্ত হন। এ বাহিনী সরাসরি প্রেসিডেন্ট বশিরের অধীনে কাজ করে এবং দারফুরের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ জয়লাভ করে। আধা সামরিক বাহিনী হিসেবে এটি দ্রুত ক্ষমতা বিস্তার করে, মানবপাচার, চাঁদাবাজি ও অবৈধ কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক ও মধ্যপ্রাচ্য সংযোগ-
হেমেদতি মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বিস্তারের জন্য সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আলাদা চুক্তি করেন। আরএসএফের সদস্যদের ভাড়াটে সেনা হিসেবে পাঠানো শুরু হয়, বিশেষ করে ইয়েমেন ও অন্যান্য সংঘর্ষপূর্ণ অঞ্চলে। এই সময়ের মধ্যে হেমেদতি ইউরোপেও নেটওয়ার্ক স্থাপন করেন এবং রাশিয়ার ভাড়াটে সেনা সরবরাহকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলেন।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ-
২০১৯ সালে সুদানের গণবিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে। হেমেদতি ও জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান বেসামরিক সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত করেন। হেমেদতি রাজধানী খার্তুমে সহিংসতা চালিয়ে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হেমেদতির বাহিনী শত শত মানুষকে হত্যা, নারীদের ধর্ষণ ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত।
২০২৩ সালে হেমেদতি রাজধানী খার্তুমে আরএসএফকে মোতায়েন করে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ও জাতীয় প্রাসাদ দখলের চেষ্টা করেন। তবে এটি ব্যর্থ হয়ে শহর ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনীগুলো খার্তুমের রাস্তায় লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে এবং দারফুরেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতে অন্তত ১৫ হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

হেমেদতির ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও প্রভাব-
বিশ্লেষকরা মনে করেন, হেমেদতির দুটি সম্ভাব্য লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইতে পারেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, ভাড়াটে বাহিনী ও রাজনৈতিক দল—তিনটি নিয়ন্ত্রণ করে আড়াল থেকে সুদানের রাজনীতি পরিচালনা করতে চাইছেন।
হেমেদতি আধুনিক অস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ শহরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছেন। তার নেতৃত্বে আরএসএফ রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুদানের ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
মানবিক প্রভাব-
হেমেদতির নেতৃত্বে আরএসএফের সহিংসতা সাধারণ জনগণের ওপর ব্যাপক মানবিক ক্ষতি ঘটিয়েছে। নিহত ও আহতের সংখ্যা হাজারের উপরে, অসংখ্য পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘ বারবার সুদানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সাম্প্রতিক হামলায় ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হওয়াও হেমেদতির বাহিনীর সহিংস কর্মকাণ্ডের প্রমাণ। এই হামলাকে জাতিসংঘ যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং সুদানের সব পক্ষকে শান্তি প্রক্রিয়ায় ফেরার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পরিশেষে, হেমেদতি সুদানের সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তার নেতৃত্বে আরএসএফ আধা সামরিক বাহিনী দেশজুড়ে প্রভাব বিস্তার করছে। সাম্প্রতিক সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে সুদানকে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে ফেরা কঠিন হয়ে পড়েছে। হেমেদতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সুদানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

