মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতি এবার সরাসরি ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আগে মূলত আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং সামরিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে আলোচিত হচ্ছিল। কিন্তু ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন হামলায় ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার পর বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জনমত এবং কূটনৈতিক মর্যাদার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
গত এক সপ্তাহে মার্কিন হামলায় অন্তত তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। আরও কয়েক ডজন ভারতীয় নাবিক বিপদের মুখে পড়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে ভারতের নাবিক পরিবার, শ্রমিক সংগঠন, বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদির বহু আলোচিত ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা কি এবার ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো বাস্তব ফল দিতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বার্থই বড় হয়ে ওঠে। হরমুজে ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনা সেই কঠিন বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
হরমুজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচল করে। তাই এখানে সামান্য সামরিক উত্তেজনাও শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে এই জলপথে সামরিক নজরদারি, অবরোধ এবং জাহাজ তল্লাশির ঝুঁকি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানি তেল বহন করে মার্কিন অবরোধ ভঙ্গ করছিল। সেই যুক্তিতেই সাম্প্রতিক হামলাগুলো চালানো হয়েছে বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু ভারতের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু অবরোধ বা জ্বালানি রাজনীতি নয়। জাহাজে ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। তাঁরা বেসামরিক নাবিক। তাঁদের কাজ ছিল জাহাজ পরিচালনা করা, কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া নয়। ফলে ভারতীয় জনমনে প্রশ্ন উঠছে—যদি জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে সন্দেহ থাকে, তাহলে সেগুলো আটক করা যেত না কেন? সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে নাবিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা কি প্রয়োজন ছিল?
তিন জাহাজে হামলা, আতঙ্কে নাবিকেরা
গত চার দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যেখানে ভারতীয় নাবিকরা কাজ করছিলেন। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা পালাউয়ের পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ এমটি সেট্টেবেলোকে ঘিরে। মার্কিন হামলায় জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হন।
এর আগে এমটি মারিভেক্স নামের আরেকটি জাহাজে হামলা হয়। ওই জাহাজে থাকা ২৪ জন ভারতীয় নাবিককে পরে উদ্ধার করা হয়। এরপর এমটি জলভীর নামের তৃতীয় জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষেও হামলা চালানো হয়।
এই ধারাবাহিক হামলা ভারতীয় নাবিকদের মধ্যে গভীর ভয় তৈরি করেছে। অনেক নাবিক এখন উপসাগরীয় অঞ্চল, ওমান উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির আশপাশে কাজ করতে আতঙ্ক বোধ করছেন। কারণ তারা জানেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে কাজ করলেও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সময় তাদের জীবন খুব সহজেই ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে।
নাবিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এসব জাহাজকে থামিয়ে তল্লাশি করতে পারত, অথবা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে পারত। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পথ বেছে নেওয়া বেসামরিক নাবিকদের জন্য অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ক্ষোভে ভারত, চাপের মুখে সরকার
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। নয়াদিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের শীর্ষ কর্মকর্তাকেও তলব করা হয়েছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের হামলা বন্ধ হওয়া উচিত এবং সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে দ্রুত শান্তি ফিরিয়ে আনা দরকার।
তবে সরকারি ভাষার চেয়ে জনমতের ভাষা অনেক বেশি তীব্র। নিহত নাবিকদের পরিবার জানতে চাইছে, শেষ মুহূর্তে তাদের প্রিয়জনদের কী হয়েছিল। উদ্ধারচেষ্টা হয়েছিল কি না। হামলার আগে সতর্কতার সুযোগ ছিল কি না। এসব প্রশ্ন শুধু ব্যক্তিগত শোকের নয়; এগুলো রাষ্ট্রের নাগরিক সুরক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে।
বিরোধী দলগুলোও মোদি সরকারকে চাপে ফেলছে। তাদের অভিযোগ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু যখন ভারতীয় নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে, তখন সেই সম্পর্কের বাস্তব ফল কোথায়?
শ্রমিক সংগঠনগুলোর বক্তব্য আরও সরাসরি। তারা বলছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিদেশি সামরিক বাহিনীর হামলায় ভারতীয় শ্রমিক নিহত হলে দিল্লিকে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। শুধু উদ্বেগ জানানো যথেষ্ট নয়; ভারতকে নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্পষ্ট কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে হবে।
ভারতীয় নাবিকেরা কেন এত ঝুঁকিতে
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় নাবিক সরবরাহকারী দেশ। প্রায় তিন লাখ ভারতীয় নাবিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে কাজ করেন। তেলবাহী জাহাজ, মালবাহী জাহাজ, কনটেইনার জাহাজসহ বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যে ভারতীয় নাবিকদের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই মধ্যপ্রাচ্য, লোহিত সাগর, ওমান উপসাগর বা হরমুজ প্রণালির মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বাড়লেই ভারতীয় নাবিকেরা সরাসরি প্রভাবিত হন। তাঁরা যুদ্ধের পক্ষ নন, কিন্তু যুদ্ধের মাঝখানে পড়ে যান। তাঁরা অস্ত্র বহন করেন না, কিন্তু অস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন। তাঁরা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন না, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের মূল্য কখনো কখনো জীবন দিয়ে দিতে হয়।
এখানেই ভারতের সমস্যা গভীর। একদিকে দেশটি বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যে বড় শ্রমশক্তি সরবরাহ করে। অন্যদিকে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সেই শ্রমশক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবসময় সহজ নয়। জাহাজের মালিকানা, পতাকা, পণ্য, রুট, বীমা, সামরিক অবরোধ—সবকিছু মিলিয়ে নাবিকেরা অনেক সময় এমন পরিস্থিতিতে আটকে পড়েন, যার ওপর তাঁদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে বড় প্রশ্ন
হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার ভেতরে হলেও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের অধীনে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিশেষ অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বা অবাধ যাতায়াতের ধারণা দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ অবরোধ ভাঙছে বলে সন্দেহ হলে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কি আইনসম্মত ও সমানুপাতিক প্রতিক্রিয়া? বিশেষ করে যখন জাহাজে বেসামরিক নাবিক আছে এবং জাহাজগুলো যুদ্ধজাহাজ নয়।
যুদ্ধাবস্থায় অবরোধ কার্যকর করার কিছু নিয়ম আছে। কিন্তু সেই নিয়মেরও সীমা আছে। বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষার বাধ্যবাধকতা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অন্যতম মূলনীতি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলা শুধু কূটনৈতিক বিতর্ক নয়, আইনি বিতর্কও তৈরি করেছে।
ভারত এই বিতর্ককে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নাবিক সুরক্ষার প্রশ্ন তুলতে পারে। কারণ এটি শুধু ভারতের সমস্যা নয়। বহু দেশের নাবিক আন্তর্জাতিক জাহাজে কাজ করেন। আজ ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন; আগামীকাল অন্য কোনো দেশের নাবিক একই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
ট্রাম্প–মোদি সম্পর্কের বাস্তব পরীক্ষা
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত সম্পর্ক একসময় ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। দুই নেতার যৌথ জনসভা, পারস্পরিক প্রশংসা এবং প্রকাশ্য সৌহার্দ্য দুই দেশের রাজনৈতিক প্রচারে বড় জায়গা পেয়েছিল।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব দিয়ে চলে না। সেখানে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, সামরিক কৌশল, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ জনমতের হিসাব থাকে।
সম্প্রতি কয়েকটি বিষয়ে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প ভারত–পাকিস্তান উত্তেজনা নিরসনে নিজের ভূমিকার কথা বলেছেন, যা নয়াদিল্লির ঐতিহ্যগত অবস্থানের সঙ্গে মেলে না। ভারত সাধারণত কাশ্মীর বা ভারত–পাকিস্তান দ্বন্দ্বে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা মেনে নেয় না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নিয়ে অসন্তোষ। আবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের যোগাযোগও ভারতের কৌশলগত মহলে অস্বস্তি বাড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনা আরও সংবেদনশীল। কারণ এবার প্রশ্নটি কেবল নীতিগত মতপার্থক্যের নয়; এটি সরাসরি ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু নিয়ে।
মোদির সামনে দ্বৈত সংকট
নরেন্দ্র মোদির সামনে এখন কঠিন দ্বৈত সংকট। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। চীনের উত্থান, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে জনমতও উপেক্ষা করা যায় না। নিহত নাবিকদের পরিবার, শ্রমিক সংগঠন, বিরোধী দল এবং গণমাধ্যম এখন সরকারের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছে। দিল্লি যদি খুব নরম প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাহলে বিরোধীরা বলবে সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখতে নাগরিক সুরক্ষার প্রশ্নে আপস করছে। আবার খুব কঠোর অবস্থান নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে।
এই ভারসাম্য রক্ষা করাই মোদির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁকে এমন ভাষা ব্যবহার করতে হবে, যাতে ভারতীয় জনমত বুঝতে পারে সরকার নাগরিকদের পাশে আছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের দরজাও বন্ধ করা যাবে না।
জি-সেভেন বৈঠক কেন গুরুত্বপূর্ণ
আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সে জি-সেভেন সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প ও মোদির সম্ভাব্য সাক্ষাৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। যদি দুই নেতার বৈঠক হয়, তাহলে ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসার সম্ভাবনা প্রবল।
এই বৈঠক মোদির জন্য সুযোগও হতে পারে, আবার ঝুঁকিও হতে পারে। সুযোগ হলো, তিনি সরাসরি ট্রাম্পের কাছে ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা, হামলা বন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়ে দাবি জানাতে পারবেন। ঝুঁকি হলো, যদি বৈঠকের পরও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে দেশে মোদি সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে, তদন্তের আশ্বাস দেয় বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সহানুভূতি জানায়, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হতে পারে। কিন্তু হামলা অব্যাহত থাকলে এবং আরও ভারতীয় নাবিক বিপদে পড়লে দুই দেশের সম্পর্কে চাপ দ্রুত বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব কী
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে বিষয়টি ইরানের তেল আয় বন্ধ করা এবং অবরোধ কার্যকর রাখার অংশ। ওয়াশিংটন মনে করে, ইরানের তেল রপ্তানি চলতে থাকলে তেহরানের সামরিক ও আঞ্চলিক সক্ষমতা বজায় থাকবে। তাই সন্দেহভাজন তেলবাহী জাহাজের ওপর চাপ বাড়ানো তাদের সামরিক কৌশলের অংশ।
কিন্তু এই কৌশলের বড় দুর্বলতা হলো মানবিক মূল্য। বাণিজ্যিক জাহাজে বিভিন্ন দেশের নাবিক কাজ করেন। তাঁরা জাহাজের মালিক নন, পণ্যের ক্রেতা নন, ভূরাজনীতির সিদ্ধান্তদাতাও নন। তাই তাঁদের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে নৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।
ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশের নাগরিক নিহত হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি আরও জটিল। কারণ ওয়াশিংটন একদিকে দিল্লিকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চায়, অন্যদিকে তার সামরিক পদক্ষেপ সেই অংশীদারের জনমনে ক্ষোভ তৈরি করছে।
ভারত কী করতে পারে
ভারতের সামনে কয়েকটি পথ আছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ আরও জোরালো করা। দ্বিতীয়ত, নিহত নাবিকদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া এবং ঘটনার পূর্ণ তদন্ত দাবি করা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা ও বহুপাক্ষিক ফোরামে বেসামরিক নাবিক সুরক্ষার বিষয়টি তোলা।
চতুর্থত, ভারতীয় নাবিকদের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাঠানোর ক্ষেত্রে নতুন সতর্কতা, রুট মূল্যায়ন এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা জোরদার করা দরকার। শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়; বাস্তব সুরক্ষা ব্যবস্থাও জরুরি।
পঞ্চমত, ভারতকে জাহাজমালিক, বীমা সংস্থা, শ্রমিক সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ নাবিকদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি—দুই ক্ষেত্রের দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত।
সম্পর্ক ভাঙবে, নাকি চাপ সামলে এগোবে
ট্রাম্প–মোদি সম্পর্ক এই ঘটনায় পুরোপুরি ভেঙে পড়বে—এমন বলা এখনই ঠিক হবে না। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন অনেক গভীর। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, চীননীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে দুই দেশই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চাইবে।
তবে এই ঘটনা সম্পর্কের ওপর দাগ ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় জনমত যদি মনে করে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় জীবনের মূল্য যথেষ্ট দিচ্ছে না, তাহলে দিল্লির জন্য ওয়াশিংটনের পাশে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্বের ভাষা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নাগরিকের জীবন তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজে ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংকট নয়; এটি ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বাস্তব পরীক্ষা।
হরমুজ প্রণালির সংঘাত এখন আর কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক দ্বন্দ্ব নয়। এটি ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন, জ্বালানি বাজার এবং ভারত–যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে গেছে।
তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু ভারতকে কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি নিজের নাগরিকের জীবন রক্ষার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেওয়াও জরুরি।
ট্রাম্প ও মোদির ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বহুবার আলোচিত হয়েছে। কিন্তু এই সংকট দেখিয়ে দিল, রাষ্ট্রীয় সম্পর্কে ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য যথেষ্ট নয়। শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক টিকে থাকে বিশ্বাস, দায়িত্ব, সম্মান এবং নাগরিক নিরাপত্তার বাস্তব নিশ্চয়তার ওপর। হরমুজের এই রক্তাক্ত ঘটনা সেই সত্যটিকেই আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

