ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দ্রুতই এক ভয়ংকর মোড়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা এখন আর কূটনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—বরং তা সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কায় রূপ নিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির পর আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কা জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাবে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—দেশটির ওপর হামলা হলে শুধু ইরান নয়, পুরো অঞ্চলই আগুনে জ্বলে উঠবে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রয়টার্স ও আল জাজিরাসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরেছে।
ইরানে বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অভিযানের ফলে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ২ হাজার ৫৭ জন ছাড়িয়েছে। এই মৃত্যুর পরিসংখ্যান ঘিরেই নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়েছে ওয়াশিংটনে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব শক্তিশালী পদক্ষেপ’ নেবে। এরই মধ্যে এরফান সোলতানি নামের এক তরুণ বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তারের মাত্র দুই দিনের মাথায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার খবর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসন এবার শুধু হুমকিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। বরং সামরিক পদক্ষেপের পথেই হাঁটছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন ইতোমধ্যে হোয়াইট হাউসের কাছে সম্ভাব্য হামলার একাধিক বিকল্প পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। এসব পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সাইবার অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে আঘাত হানার প্রস্তাব।
এই উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে সেনাসদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কাতারসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। লোহিত সাগরে বর্তমানে ইউএসএস রুজভেল্টসহ যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
এদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগ কার্যত ভেঙে পড়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংলাপ বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেকোনো বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তেহরান বিন্দুমাত্র আপস করবে না।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, বিক্ষোভ ঘিরে এখন পর্যন্ত ১৮ হাজার ১৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেনি দ্রুত বিচার কার্যক্রমের মাধ্যমে অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যা মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এই উত্তেজনা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। রাশিয়া ও চীন সরাসরি বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ইরানে হামলা চালানো হোয়াইট হাউসের জন্য একটি ‘বড় ভুল’ হবে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও সংঘাত নয়, সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প হয়তো পূর্ণমাত্রার স্থল যুদ্ধের পথে না গিয়ে ২০২০ সালের মতো লক্ষ্যভিত্তিক হামলার কৌশল বেছে নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, কৌশলগত স্থাপনা বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ড্রোন কিংবা বিমান হামলার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে ইরান ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়—বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য এক বিপজ্জনক মোড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

