ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও দক্ষিণ আমেরিকার মেরকোসুর জোটের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে বহুল আলোচিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলা আলোচনার পর শনিবার ১৭ জানুয়ারি প্যারাগুয়ের রাজধানী আসুনসিওনে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের পথ খুলে গেল।
চুক্তির আওতায় ইইউর ২৭টি দেশ এবং মেরকোসুরভুক্ত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্যে শুল্ক ও নানা ধরনের বাধা বড় আকারে কমাবে। চুক্তিটি কার্যকর হলে এটি হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি।
তবে এখনই চুক্তিটি কার্যকর হচ্ছে না। এর জন্য ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন এবং মেরকোসুরভুক্ত দেশগুলোর জাতীয় সংসদে অনুমোদন প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সব প্রক্রিয়া শেষ হলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চুক্তিটি বাস্তবায়ন শুরু হবে।
চুক্তি অনুযায়ী ৯০ শতাংশের বেশি পণ্যের ওপর শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়া বা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হবে। এতে ইউরোপীয় দেশগুলো গাড়ি, ওয়াইন ও চিজ রপ্তানিতে বাড়তি সুবিধা পাবে। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো ইইউতে গরুর মাংস, পোলট্রি, চিনি, চাল, মধু ও সয়াবিন তুলনামূলক সহজে রপ্তানি করতে পারবে।
মেরকোসুরের পূর্ণ নাম সাউদার্ন কমন মার্কেট বা মার্কেডো কমোন ডেল সার। ১৯৯১ সালে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে এই জোট গঠিত হয়। বর্তমানে এর সদস্য আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে। ভেনেজুয়েলার সদস্যপদ স্থগিত রয়েছে। বলিভিয়া যোগদানের অপেক্ষায় আছে।
মেরকোসুরের মূল লক্ষ্য হলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শুল্ক কমানো বা তুলে দেওয়া, পণ্য, সেবা ও বিনিয়োগের মুক্ত প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং ইইউর মতো বাইরের জোটের সঙ্গে যৌথ বাণিজ্য চুক্তি করা।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, শুল্কের পরিবর্তে ন্যায্য বাণিজ্যকে বেছে নেওয়া হয়েছে। বিচ্ছিন্নতার বদলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা বলেন, বৈশ্বিক উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার সময়ে এই চুক্তি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পক্ষে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।
ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা চুক্তিটিকে সুরক্ষাবাদ ও অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় প্রতিরক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে চুক্তিটি নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। ইউরোপের কৃষক ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, দক্ষিণ আমেরিকার সস্তা কৃষিপণ্যের কারণে ইউরোপীয় কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। পাশাপাশি বন উজাড়ের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন। এসব আশঙ্কা থেকে গত সপ্তাহে আয়ারল্যান্ডে হাজারো কৃষক চুক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন।
সব মিলিয়ে ইইউ ও মেরকোসুরের নেতারা বলছেন, এই চুক্তি দুই অঞ্চলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অঙ্গনে বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রতি তাদের অঙ্গীকার আরও শক্ত হবে।

