ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের ধারণা একসময় সহ্য করা আরব সরকারগুলো এখন সংযতের আহ্বান জানাচ্ছে। তারা এখন স্বীকার করছে যে, ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদই এ অঞ্চলের প্রধান হুমকি হয়ে উঠছে। এক কথায়, ইসরায়েলি সম্প্রসারণে শঙ্কিত আরব বিশ্ব।
অথচ কয়েক বছর আগেও উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বহু আরব রাষ্ট্র ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সরকার পরিবর্তনের সামরিক অভিযানের ধারণাকে ইতিবাচকভাবে দেখত। দীর্ঘদিন ধরে তারা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হামলার কথা ভাবছেন, তখন সেই আরব নেতারাই ওয়াশিংটনের ওপর চাপ দিচ্ছেন—ইরানে হামলা না চালানোর জন্য।
আরব নেতাদের এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক নাটকীয় ভূরাজনৈতিক রূপান্তর। গত ২৭ মাস ধরে তারা প্রত্যক্ষ করেছে ইসরায়েলের নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসন, যা বিশ্লেষকদের মতে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ। এই সম্প্রসারণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বাইবেলভিত্তিক এক ভূখণ্ড কল্পনা করে, যা ইরাকের ইউফ্রেটিস নদী থেকে মিশরের নীলনদ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইসরায়েল শুধু গাজায় গণহত্যা চালিয়েই থামেনি বরং পশ্চিম তীর, সিরিয়া ও লেবাননে তার অবৈধ দখল আরও গভীর করেছে। আরব বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করেছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারে ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলা—যে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এর কয়েক মাস আগেই জুনে ইসরায়েলের প্ররোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, যার লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা থেকে বঞ্চিত রাখা এবং ইসরায়েলকে অঞ্চলের একমাত্র পারমাণবিক শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখা।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনাগুলো আরব নেতাদের চোখে ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্যের লক্ষ্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তাদের আশঙ্কা, ইরানে মার্কিন হামলা হলে তা কেবল ইসরায়েলি আগ্রাসনের ধারাবাহিকতাই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করবে।
যদিও ইসরায়েল প্রকাশ্যে ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে, তথাপি বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে—ইরানের অভ্যন্তরীণ সরকারবিরোধী আন্দোলনে ইসরায়েল সক্রিয়ভাবে ইন্ধন জোগাচ্ছে।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং ইসরায়েলের হেরিটেজমন্ত্রী আমিখাই এলিয়াহু সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিক্ষোভে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা থাকতে পারে। এমনকি ইসরায়েলের একটি টেলিভিশন চ্যানেল দাবি করেছে, বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র সরবরাহেও ইসরায়েলের হাত থাকতে পারে।
আরব সরকারগুলো এসব তথ্যকে দেখছে ইরানে সরকার পরিবর্তনের জন্য ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অতীত গোপন হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতার আলোকে। তবে ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদই একমাত্র কারণ নয়।
২০২৩ সালের পর থেকে ইরান নিজেই উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। কঠোর নিষেধাজ্ঞায় দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি হামলায় সামরিক এবং পারমাণবিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত। ইরানের আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্কও ভেঙে পড়ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর লাগাতার হামলা এর উদাহরণ।
এ প্রেক্ষাপটে আরব নেতারা মনে করছেন, আরও হামলা অপ্রয়োজনীয় এবং উল্টো ক্ষতিকর হতে পারে। তাদের দৃষ্টিতে দুর্বল ইরান হয়তো সহনীয়, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়া একটি ইরান গোটা অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ অস্থিরতা ডেকে আনবে।
বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো উদ্বিগ্ন জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে। ইরানে হামলা হলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি হুমকির মুখে পড়তে পারে, যা বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিশরও আশঙ্কা করছে, ইরানে অস্থিতিশীলতা বাড়লে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ঘিরে অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য মারাত্মক।
এসব ঘটনার ফলে আরব বিশ্বের হুমকির মানচিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেখানে ইরান ছিল সৌদি আরবের প্রধান শত্রু বা কাতার ছিল মিশরের দৃষ্টিতে অস্থিরতার উৎস—সে চিত্র এখন বদলে গেছে। ক্রমেই, সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্যতীত অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলকেই অঞ্চলের সবচেয়ে অস্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখছে।
সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত।

