চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লম্ফনের দিকে। গত পাঁচ বছরে মোট বাণিজ্যের মূল্য ৪০ ট্রিলিয়ন থেকে ৪৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের সীমা পেরিয়ে ২০২৫ সালে পৌঁছেছে ৪৫.৪৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে। টানা ৯ বছর ধরে এই বৃদ্ধিই শুধু পরিসংখ্যান নয়, বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলছে।
রফতানিতে চীন কেবল পণ্য বিক্রি করছে না, বরং ‘উইন-উইন’ সহযোগিতার মডেল দেখাচ্ছে। ২০২৫ সালে বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্য মূল্য দাঁড়ায় ১৩.২৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ান। সেমিকন্ডাক্টর, অটো পার্টসসহ হাইটেক পণ্যে এদের অবদান বড়। উদাহরণ হিসেবে ইন্টেলের ছেংতু চিপ কারখানা এবং টেসলার শাংহাই গিগাফ্যাক্টরি বিশ্ববাজারে প্রযুক্তি সরবরাহ করছে।
এই ব্যবস্থায় লাভবান হচ্ছে সাধারণ ভোক্তারাও। সোলার প্যানেল, নতুন জ্বালানির গাড়ি, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি ‘মেড ইন চায়না’ দ্রুত ও কম দামে বাজারে পৌঁছাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চীনা পণ্য না থাকলে দেশটির পরিবারের খরচ বেড়ে যেত ৪.২ শতাংশ। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সবুজ রূপান্তরে। চীনের সৌর ও বায়ু প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সাশ্রয়ী করেছে। বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স সাম্প্রতিক সময়ের বড় অগ্রগতি হিসেবে এটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
চীন কেবল রফতানিমুখী নয়, আমদানিতেও সমান জোর দিচ্ছে। ২০২৫ সালে আমদানি রেকর্ড ১৮.৪৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে। শুল্কহার নামানো হয়েছে ৭.৩ শতাংশে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা চালু রয়েছে। এই নীতির ধারাবাহিকতায় হাইনান ফ্রি ট্রেড পোর্টে শুল্কমুক্ত পণ্যের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। সিমেন্স এনার্জির মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সেখানে নতুন বিনিয়োগ শুরু করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীনে উৎপাদন ও বিশ্ববাজারে বিক্রির এই মডেল বিদেশি উদ্যোগগুলোকে চীনের শিল্প-শৃঙ্খল সুবিধা কাজে লাগিয়ে মুনাফা বাড়াতে সাহায্য করছে। ২০২৫ সালের কেপিএমজি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৬৪ শতাংশ বহুজাতিক উদ্যোগ উৎপাদন ক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় গবেষণা ও উন্নয়ন বাড়ানোর জন্য চীনে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাও জানিয়েছেন, ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময়কালে (২০২৬-২০৩০) চীন আমদানি ও রফতানির সুষম উন্নয়ন অগ্রাধিকার দেবে। উদ্ভাবনী বাণিজ্য, বাজার বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সঞ্চালন মসৃণ করতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ওয়াং বলেন, চীন আন্তর্জাতিক ভোক্তা পরিবেশ গড়ে তুলবে। ‘চায়নায় দোকান’ ব্র্যান্ড তৈরি করবে। পর্যটকদের জন্য কর ফেরত নীতি উন্নত করবে। আন্তর্জাতিক ভোগ কেন্দ্র শহরের উন্নয়নও এগিয়ে নেবে।
বিশ্ব অর্থনীতি অনিশ্চিত হলেও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্র। উন্মুক্ততা, ভারসাম্য ও সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে চীন শুধু নিজের নয়, বৈশ্বিক সমৃদ্ধির পথও প্রশস্ত করছে।

