ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানাপোড়েন যখন চরমে, তখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অজানা আতঙ্ক। যেকোনো সময় তেহরানে মার্কিন সামরিক হামলা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সংঘাত ঠেকাতে এগিয়ে আসেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। নীরব কূটনীতির পথে তিনি চেষ্টা শুরু করেন দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশকে আলোচনার টেবিলে বসাতে। সেই উদ্যোগই ধীরে ধীরে গলাতে শুরু করেছে বহুদিনের জমে থাকা কূটনৈতিক বরফ।
এরদোগানের মধ্যস্থতার পর ইরান প্রথমবারের মতো পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত দেয়। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় বসার প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। এই ঘোষণার পর ওয়াশিংটন থেকেও আসে আশাবাদের সুর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, একটি সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে তিনি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইরানে সহিংস বিক্ষোভ ও সেসব দমনে কঠোর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক কার্যত তলানিতে ঠেকে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে এক পর্যায়ে সরাসরি সামরিক হামলার হুমকি দেন ট্রাম্প। সেই হুমকিকে বাস্তব রূপ দিতে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয় যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী ‘আব্রাহাম লিংকন’সহ একাধিক ডেস্ট্রয়ার।
তবে ইরানও স্পষ্ট বার্তা দেয়—হামলা হলে তা শুধু দ্বিপাক্ষিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং গোটা অঞ্চলকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে। তেহরানের এই হুঁশিয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটেই সংঘাত এড়ানোর পথ খুঁজতে সক্রিয় হয় তুরস্ক। সম্প্রতি তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে বৈঠক করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরগচী। ওই বৈঠকে ফিদান স্পষ্টভাবে ইরানে যেকোনো সামরিক হামলার বিরোধিতা করেন এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানে তুরস্কের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এরপর এরদোগান নিজেই উদ্যোগ নেন। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করেন এবং দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে টেলিকনফারেন্স আয়োজনের ব্যবস্থাও করেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই আলোচনাই ভবিষ্যতের আনুষ্ঠানিক সংলাপের ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন তুরস্ক আনুষ্ঠানিক আলোচনার মঞ্চ প্রস্তুতের দিকেই এগোচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকি স্পষ্ট কিছু না জানালেও আলোচনার অগ্রগতির ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য বেশ কিছু বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে কাজ চলছে। শিগগিরই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তবে তেহরান এক জায়গায় কোনো ছাড় দিতে নারাজ—পরমাণু কর্মসূচি। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলী বাঘেরি পরিষ্কারভাবে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবেও ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্য কোনো দেশের হাতে তুলে দেবে না। এ ধরনের গুঞ্জনকে তিনি ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দেন। তার ভাষায়, ইরান কখনোই ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে আলোচনা বা দরকষাকষিতে যাবে না।
সব মিলিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে যুদ্ধের বাস্তব আশঙ্কা, অন্যদিকে আলোচনার ক্ষীণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। তুরস্কের মধ্যস্থতা এই উত্তেজনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে কি না, সেটাই এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

